ফেনী সদর উপজেলার শর্শদী ইউনিয়নে বাড়ি দখল ও বসতবাড়িতে বসবাস নিয়ে দীর্ঘদিনের পারিবারিক বিরোধের অবসান হয়েছে। কুয়েত ফেরত বাবা জামাল হোসেন এবং সৌদি আরব ফেরত ছেলে নজরুল ইসলাম রাব্বির মধ্যকার এই দ্বন্দ্ব শেষ পর্যন্ত স্থানীয় প্রশাসন ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মধ্যস্থতায় মিটেছে।
গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) ফেনী সদর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে উভয় পক্ষের শুনানির মাধ্যমে এই সমঝোতা প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শর্শদী ইউনিয়নের বাসিন্দা ও কুয়েতপ্রবাসী জামাল উদ্দিনের প্রথম সংসারের সন্তান হলেন সৌদিপ্রবাসী নজরুল ইসলাম রাব্বি। মূলত ঘর দখল এবং বসতবাড়িতে থাকা নিয়ে বাবা ও ছেলের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে বিরোধ চলে আসছিল।
গত ২৮ সেপ্টেম্বর নজরুল ইসলাম সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরে এলেও পারিবারিক কলহের কারণে তিনি বাবার বাড়িতে প্রবেশ করতে পারেননি। এই পরিস্থিতিতে বাবা ও ছেলে উভয়েই একে অপরের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ আনেন। বিরোধের চরম পর্যায়ে কেউই নিজেদের ঘরে থাকতে না পেরে গৃহহীন হয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে নজরুল ইসলাম তার চাচার দোকানে রাত কাটাতে বাধ্য হন, অন্যদিকে তার বাবা শহরের শাহিন একাডেমির একটি ভাড়া বাসায় অবস্থান করছিলেন। এই ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোচনা ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।
পারিবারিক এই সংকট সমাধানে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা এবং জেলা প্রশাসকের পরামর্শ অনুযায়ী শর্শদী ইউনিয়ন পরিষদ ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। অবশেষে শনিবার বিকেলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে একটি আনুষ্ঠানিক শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত শুনানিতে অভিযোগকারী নজরুল ইসলাম রাব্বি, তার বাবা জামাল উদ্দিন, সদর উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা ও আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইকবাল হোসেন ভূঁইয়া, শর্শদী ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিনিধি এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
শুনানি শেষে উভয় পক্ষের সম্মতিতে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, জামাল উদ্দিন আগামী এক বছরের মধ্যে শর্শদী বাজারের আশপাশে রাস্তার পাশে বা রাস্তা-সংলগ্ন এলাকায় তার ছেলে নজরুল ইসলাম রাব্বি ও মেয়ে রাবেয়া আক্তার রাফির জন্য মোট ৬ শতক জমি কিনে দেবেন। এই শর্ত সম্পূর্ণভাবে পালন না করা পর্যন্ত বর্তমানে ৭৭১ নম্বর হোল্ডিংয়ের বাড়িটি বিক্রি করা যাবে না।
পাশাপাশি, জামাল উদ্দিন তার তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রী বিবি ফাতেমার কাবিনের বকেয়া বাবদ ছয় লাখ টাকা আগামী বছরের ২০ জানুয়ারির মধ্যে পরিশোধ করবেন। এছাড়া উভয় পক্ষ আগামী ৫ নভেম্বরের মধ্যে নিজেদের মধ্যে চলমান সব মামলা আইনানুগভাবে প্রত্যাহার করে নেবেন বলে সম্মত হয়েছেন।
এই বিষয়ে নজরুল ইসলাম রাব্বি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “আজ ইউএনও ম্যাডামের মধ্যস্থতায় আমাদের বাবা-ছেলের মধ্যে সমঝোতা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। তিনি যেহেতু আমাকে ঘরে জায়গা দেবেন না, তাই অন্যত্র ঘর করার জন্য জমি কিনে দেবেন। পুরোনো বাড়িও বিক্রি করতে পারবেন না। আমি প্রাথমিকভাবে সমঝোতার প্রস্তাবে সম্মত আছি। বাকি বিষয়গুলো আমার বাবা কতটুকু বাস্তবায়ন করেন, তা দেখে মতামত জানাব।”
অন্যদিকে, নজরুলের বাবা জামাল উদ্দিন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “প্রথমেই আমাদের পারিবারিক বিষয়টি মীমাংসা করার জন্য ফেনী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং শর্শদী ইউনিয়নের প্রশাসককে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। তাদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় আমরা একটি সমঝোতায় পৌঁছেছি। আমার পক্ষ থেকে যা যা করণীয়, তা করব।”
পুরো বিষয়টি নিশ্চিত করে ফেনী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুলতানা নাসরিন কান্তা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “শনিবার উভয়পক্ষের শুনানি শেষে প্রশাসনের মধ্যস্থতায় লিখিতভাবে সমঝোতায় পৌঁছান তারা। ভবিষ্যতে পরস্পরের মধ্যে শান্তি বজায় রেখে মিলেমিশে চলার অঙ্গীকারও করেছেন। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে চলা পারিবারিক বিরোধের নিষ্পত্তি হয়েছে।”