সুন্দরবনে চিকিৎসা শেষে অবমুক্ত করার তিন মাস অতিবাহিত হলেও সেই বাঘিনীটির আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। বাঘিনীটির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করার লক্ষ্যে বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের আন্ধারমানিক এলাকায় আট বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে মোট ৪০টি ক্যামেরা ট্র্যাপ বা ক্যামেরা ফাঁদ স্থাপন করা হয়েছিল। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, কোনো ক্যামেরাতেই বাঘিনীটির ছবি ধরা পড়েনি। দীর্ঘ তিন মাস অপেক্ষার পর গত সপ্তাহে বন বিভাগ ওই এলাকা থেকে ক্যামেরাগুলো সরিয়ে নিয়েছে।

বর্তমানে বাঘিনীটির অবস্থান নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। সে কি সুস্থ হয়ে সুন্দরবনের অন্য কোনো এলাকায় চলে গেছে, নাকি অসুস্থতা অথবা শিকারিদের আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছে? পরিবেশবাদীদের একাংশ আশঙ্কা করছেন, বাঘিনীটি পাচারকারীদের কবলে পড়ে আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী পাচারের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল’-এ পাচার হয়ে যেতে পারে। তবে বন বিভাগের দাবি, বাঘিনীটি বেঁচে আছে এবং অন্য কোনো এলাকায় চলে যাওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আশা, আগামী বছরের শুরুতে সুন্দরবনজুড়ে বাঘশুমারি শুরু হলে তার সন্ধান পাওয়া যেতে পারে।

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত ৩ জানুয়ারি বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের বদ্যমারী টহল ফাঁড়ির আওতাধীন শরকির খালসংলগ্ন বনে শিকারিদের পাতা ফাঁদে আটকা পড়েছিল বাঘিনীটি। এতে তার সামনের বাঁ পায়ে গুরুতর ক্ষত তৈরি হয় এবং পরবর্তীতে সেখানে পচন ধরে। বন বিভাগ তাকে উদ্ধার করে খুলনার বয়রায় বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসন কেন্দ্রে নিয়ে যায়। সেখানে পাঁচ সদস্যের এক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দলের তত্ত্বাবধানে ছয় মাস চিকিৎসা ও পরিচর্যা শেষে বাঘিনীটি সুস্থ হয়ে ওঠে।

আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএন-এর কাছ থেকে নির্ধারিত সময়ে স্যাটেলাইট কলার না পাওয়ায় বাঘিনীটির গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে আন্ধারমানিক এলাকার আট বর্গকিলোমিটারজুড়ে ২০টি সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়। এরপর গত ১২ জুলাই উদ্ধারস্থলের কাছাকাছি আন্ধারমানিক ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রসংলগ্ন বনে কোনো ধরনের ট্র্যাকিং ডিভাইস ছাড়াই বাঘিনীটিকে অবমুক্ত করা হয়। চিকিৎসা শেষে সুন্দরবনে কোনো বাঘ অবমুক্ত করার ক্ষেত্রে এটিই ছিল প্রথম ঘটনা।

তবে অবমুক্তির সময় ধারণ করা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে বাঘিনীটির শারীরিক দুর্বলতা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। খাঁচা থেকে বেরিয়ে বনে যাওয়ার সময় তাকে ডানে-বামে টলতে দেখা যায়। এমনকি শক্তভাবে দাঁড়াতেও তার কষ্ট হচ্ছিল এবং সে বারবার পেছনে ফিরে তাকাচ্ছিল। এই দৃশ্য সামনে আসার পর বাঘিনীটির শারীরিক সক্ষমতা এবং বনের পরিবেশে টিকে থাকার ক্ষমতা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দেয়।

অবমুক্তির পর প্রায় দেড়শ মিটার পর্যন্ত বাঘিনীটির পায়ের ছাপ পাওয়া গিয়েছিল, তবে এরপর আর তার কোনো চিহ্ন মেলেনি। পরবর্তী সময়ে আন্ধারমানিক এলাকায় বসানো ৪০টি ট্র্যাপিং ক্যামেরায় অন্য তিনটি বাঘিনীর ছবি ধরা পড়লেও চিকিৎসা শেষে অবমুক্ত করা বাঘিনীটির কোনো ছবি পাওয়া যায়নি। বন বিভাগের কর্মীরা গত তিন মাসে সুন্দরবনের দুর্গম এলাকায় মাইলের পর মাইল হেঁটে একাধিকবার অনুসন্ধান চালিয়েছেন। তবে বাঘিনীটির মৃত্যু বা অন্য কোনো দুর্ঘটনার পক্ষে কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত গত সপ্তাহে এলাকাটি থেকে ক্যামেরাগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়।

এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সুন্দরবনসংলগ্ন পাঁচ জেলার গণমাধ্যমকর্মীদের সংগঠন ‘সুন্দরবন সাংবাদিক ফোরাম’-এর সভাপতি ও পরিবেশবিদ মনিরুজ্জামান নাসিম আলী। তিনি বলেন, “নিজের আবাসস্থল থেকে দীর্ঘ ছয় মাস বাইরে এনে চিকিৎসা দেওয়ার পর কোনো ধরনের ট্র্যাকিং ডিভাইস না পরিয়ে বাঘিনীটিকে বনে অবমুক্ত করা সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল না। ৪০টি ট্র্যাপিং ক্যামেরার একটিতেও তার ছবি না পাওয়া চিন্তার বিষয়। বন বিভাগ বলছে, ওই এলাকায় অন্য তিনটি বাঘিনীর বিচরণ থাকায় সে অন্যত্র চলে গেছে। কিন্তু বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার মতো সঠিক তথ্য কোথায়?”

তিনি আরও বলেন, “ট্র্যাকিং ডিভাইস পরানো থাকলে সুন্দরবনের কোন এলাকায় বাঘিনীটি রয়েছে, তা সহজেই জানা সম্ভব হতো। দুর্গম সুন্দরবনে অনেক ঘটনাই ঘটে, কিন্তু প্রমাণের অভাবে গণমাধ্যমকর্মীদের পক্ষে সব তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব হয় না। বন্যপ্রাণী পাচার ও শিকারিদের অপতৎপরতা পুরোপুরি দমন করাও কঠিন। বাঘিনীটি অবমুক্তির পর মারা গেছে, নাকি আবারও শিকারিদের কবলে পড়েছে তা দ্রুত পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।”

সুন্দরবন রক্ষায় কর্মরত সংগঠন আমরার সমন্বয়কারী পরিবেশবিদ নূর আলম শেখ বলেন, “অবমুক্তির তিন মাসের মধ্যে ৪০টি ট্র্যাপিং ক্যামেরার একটিতেও বাঘিনীটির ছবি না পাওয়া সত্যিই ভাবনার বিষয়। অবমুক্তির সময় ধারণ করা ভিডিওতে তাকে পুরোপুরি সুস্থ মনে হয়নি, খাঁচা থেকে বের হওয়ার পর সে টলছিল। এমন শারীরিক অবস্থায় বাঘিনীটি স্বাভাবিকভাবে শিকার ধরে টিকে থাকতে পারবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।”

তিনি আরও যোগ করেন, “অবমুক্তির পর দেড়শ মিটার পর্যন্ত পায়ের ছাপ পাওয়া গেলেও এরপর আর কেন কোনো চিহ্ন পাওয়া গেল না, তা বন বিভাগকে পরিষ্কার করতে হবে। বাঘিনীটি মারা গিয়ে থাকতে পারে, আবার শিকারিদের কবলেও পড়তে পারে।”

সার্বিক বিষয়ে পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, “বাঘিনীটিকে অবমুক্ত করার পর প্রায় দেড়শ মিটার পর্যন্ত তার পায়ের ছাপ পাওয়া গিয়েছিল। চেতনানাশক ওষুধ প্রয়োগের পর অবমুক্ত করার মুহূর্তে কিছুটা দুর্বলতা থাকলেও পরে তার স্পষ্ট পায়ের ছাপ পাওয়া যায়, যা নির্দেশ করে তার অবস্থা স্বাভাবিক ছিল।”

তিনি আরও বলেন, “আন্ধারমানিক এলাকার আট বর্গকিলোমিটার জুড়ে বসানো ৪০টি ট্র্যাপিং ক্যামেরার পাশাপাশি বন বিভাগ নিবিড় নজরদারি চালিয়েছে। এসব ক্যামেরায় গত তিন মাসে অন্য তিনটি বাঘিনীর ছবি ধরা পড়লেও অবমুক্ত করা বাঘিনীটির ছবি পাওয়া যায়নি। তবে ক্যামেরায় ছবি না পাওয়ার অর্থ এই নয় যে বাঘিনীটি মারা গেছে বা কোনো দুর্ঘটনায় পড়েছে। একটি এলাকায় অন্য তিনটি বাঘিনীর বিচরণ থাকলে বাঘ নিজের আধিপত্য বজায় রাখতে অন্য এলাকায় চলে যেতে পারে।”

বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আরও জানান, একটি বাঘ সাধারণত ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিচরণ করে। বাঘিনীটি অন্য এলাকায় চলে গেলে তা ক্যামেরার আওতার বাইরে থাকাটাই স্বাভাবিক। তাই আপাতত ক্যামেরাগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “বাঘিনীটি মারা যায়নি বা পাচারকারীদের কবলেও পড়েনি এ বিষয়ে আমরা আশাবাদী। গত তিন মাসে বনরক্ষীরা একাধিকবার দীর্ঘ পথ হেঁটে তল্লাশি চালিয়েছেন, কিন্তু কোথাও বাঘের মৃত্যুর কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। আগামী বছরের শুরুতে পুরো সুন্দরবনে ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ের মাধ্যমে বাঘশুমারি শুরু হলে বাঘিনীটির সন্ধান মিলবে বলে আমরা আশা করছি।”