জন্মগতভাবে দুই হাত না থাকা সত্ত্বেও অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে জীবনসংগ্রাম জয় করেছেন মো. আলতাফ হোসেন। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাঁকে দমাতে পারেনি; বরং পা দিয়েই লিখতে শিখেছেন তিনি। নিজের সঞ্চিত অর্থ এবং পৈতৃক জমি বিক্রির টাকা দিয়ে গড়ে তুলেছেন একটি বিদ্যালয়, যেখানে বর্তমানে ১৪৫ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে এবং ১০ জন শিক্ষক কর্মরত আছেন। আলতাফ হোসেনের এই অনন্য জীবনসংগ্রাম ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগের কথা শুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিদ্যালয়টির জন্য নতুন ভবন নির্মাণের আশ্বাস দিয়েছেন।

আজ বুধবার রাজধানীর সচিবালয়ে অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আলতাফ হোসেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন প্রধানমন্ত্রী। এই সাক্ষাতের সুযোগ পান আরও দুজন ব্যক্তি—বুয়েট থেকে স্নাতক শেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়া নায়লা শারাফ এবং ভোলার রেজাউল কিবরিয়া বাবুল, যিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে হাজার হাজার গাছ রোপণ করেছেন।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এই তিন ব্যক্তিত্ব। প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত মনোযোগের সাথে তাঁদের জীবনযুদ্ধের গল্প, ব্যতিক্রমী উদ্যোগ এবং সমাজের কল্যাণে পরিচালিত বিভিন্ন কার্যক্রমের কথা শোনেন। তাঁদের এই নিঃস্বার্থ কাজের ভূয়সী প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেন।

সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশ গঠনে আপনাদের মতো মানুষের অনেক প্রয়োজন। আপনাদের মতো সবাই এগিয়ে এলে দেশ গঠন সহজ হবে।’

মো. আলতাফ হোসেনের জীবনযুদ্ধের কথা বিস্তারিত জানা গেছে। জন্ম থেকেই দুই হাত না থাকলেও তিনি দমে যাননি। পা দিয়ে লেখালেখি করার দক্ষতা অর্জন করেন তিনি। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে নরসিংদীর পাঁচদোনায় ‘প্রতিভা দুঃখু মিয়া কিন্ডারগার্টেন স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেন। নিজের সঞ্চয় ও পৈতৃক সম্পদ বিক্রির অর্থ দিয়ে গড়ে তোলা এই বিদ্যালয়ে বর্তমানে ১৪৫ জন শিক্ষার্থী শিক্ষালাভ করছে এবং ১০ জন শিক্ষক কর্মরত আছেন। পা দিয়েই তিনি লেখালেখির পাশাপাশি বিদ্যালয়ের যাবতীয় প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন।

অন্যদিকে, নায়লা শারাফ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে পড়াশোনা শেষ করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। এরপর তিনি জনতা ব্যাংকেও কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এমনকি ৩৪তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়েও তিনি সরকারি উচ্চপদস্থ চাকরির মোহ ত্যাগ করে শিশুদের শিক্ষাদানের পথ বেছে নেন। গত সাত বছর ধরে নেত্রকোনার পাঁচআননপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন তিনি। বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য পাঠদান সহজ করতে তিনি নিজেই বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণ ও ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করেন।

ভোলার চরফ্যাশনের রেজাউল কিবরিয়া বাবুল মসজিদের ইমামতির পাশাপাশি প্রায় তিন দশক ধরে নিজের অর্থ ও শ্রম ব্যয় করে বিভিন্ন রাস্তার পাশে হাজার হাজার গাছ লাগিয়েছেন। পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে তিনি একটি নার্সারি গড়ে তোলেন এবং সেখান থেকে উৎপাদিত চারা বিভিন্ন এলাকায় রোপণ করেন। তাঁর লাগানো সেই গাছগুলো এখন বড় হয়ে পথচারীদের প্রশান্তির ছায়া দিচ্ছে।

তিনজনের এই অসাধারণ উদ্যোগের প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উল্লেখ করেন যে, সমাজ ও দেশের কল্যাণে ব্যক্তিগত উদ্যোগে কাজ করা মানুষের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মনে করেন, এ ধরনের দৃষ্টান্তমূলক উদ্যোগ অন্যদেরও ভালো কাজে উৎসাহিত করবে।

সাক্ষাৎ শেষে প্রধানমন্ত্রী তাঁদের নিজ নিজ কার্যক্রম অব্যাহত রাখার জন্য উৎসাহ প্রদান করেন এবং সব ধরনের প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন।