গত এক দশকে মালয়ালম চলচ্চিত্র শিল্প অত্যন্ত চমৎকার সব থ্রিলার সিনেমা উপহার দিয়েছে। বিশেষ করে পুলিশি তদন্ত কেন্দ্রিক গল্পের ক্ষেত্রে এই ইন্ডাস্ট্রির সাফল্য সত্যিই ঈর্ষণীয়। বাংলাদেশেও মালয়ালম থ্রিলারের এক বিশাল ভক্তগোষ্ঠী রয়েছে, যার প্রমাণ মেলে সিনেমা মুক্তির পরপরই দ্রুত বাংলা সাবটাইটেল তৈরি হয়ে যাওয়ার ঘটনায়। তবে মালয়ালম থ্রিলারের কথা উঠলেই সবার আগে যে সিনেমার নাম মনে পড়ে, তা হলো ‘দৃশ্যম’। ২০১৩ সালে মুক্তি পাওয়া জিতু জোসেফের এই সিনেমাটির প্রভাব এতটাই ব্যাপক যে, প্রথম কিস্তির পর এক দশকের ব্যবধানে আরও দুটি কিস্তি মুক্তি পেয়েছে এবং এর হিন্দি রিমেকও তৈরি হয়েছে। ফলে পুলিশি তদন্তের কোনো থ্রিলার সিনেমা ভালো হলেই তা অবধারিতভাবে ‘দৃশ্যম’–এর সঙ্গে তুলনা করা হয়। এবার তেমনটিই ঘটেছে নতুন মালয়ালম থ্রিলার ‘প্রধমা দৃষ্টিয়া কুট্টাকার’–এর ক্ষেত্রে। স্বল্প বাজেটে নির্মিত এই সিনেমাটি গত মাসে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির পর দারুণ ব্যবসা করেছে এবং ৯ অক্টোবর এটি ওটিটি প্ল্যাটফর্মেও মুক্তি পায়। সিনেমাটি দেখার পর অনেক দর্শকের মন্তব্য—‘দৃশ্যম’–এর চেয়ে ভালো! তবে প্রশ্ন থেকে যায়, সিনেমাটি কি সত্যিই সেই পর্যায়ের?
সিনেমাটি সম্পর্কে একনজরে: ‘প্রধমা দৃষ্টিয়া কুট্টাকার’ একটি ক্রাইম–থ্রিলার ঘরানার ছবি, যার পরিচালনা করেছেন শাহাদ। অভিনয়ে রয়েছেন পার্বতী, বিজয়ারাঘবন, সিদ্ধার্থ ভরতন, ম্যাথু থমাস, বিনয় ফোর্ট ও উন্নিমায়া প্রসাদ। নেটফ্লিক্সে স্ট্রিমিং করা এই সিনেমাটির দৈর্ঘ্য ২ ঘণ্টা ৩৮ মিনিট।
‘প্রধমা দৃষ্টিয়া কুট্টাকার’ শব্দটির অর্থ হলো প্রথম দৃষ্টিতে অপরাধী। সিনেমার শুরুতে পুলিশ কর্মকর্তাদের পরিচয় করিয়ে দিতে চিত্রনাট্যকারদের কেন এত সময় ব্যয় করা হয়েছে, তা নিয়ে দর্শকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে। তবে গল্পের অগ্রগতির সাথে সাথে এটি স্পষ্ট হয় যে, চরিত্রগুলোর ব্যক্তিগত জীবন এবং তাদের দুর্বলতাগুলো ফুটিয়ে তোলার পেছনে নির্মাতাদের একটি বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল। যৌক্তিক কারণেই অনেক দর্শক এই ছবির সঙ্গে জিতু জোসেফের ‘দৃশ্যম’–এর মিল খুঁজে পেয়েছেন। কারণ, সেই সিনেমাতেও অপরাধে জড়িয়ে পড়া একটি পরিবারের প্রতি দর্শকদের সহানুভূতি তৈরি হয়েছিল। তবে ‘প্রধমা দৃষ্টিয়া কুট্টাকার’ অপরাধের বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে উপস্থাপন করেছে। এখানে গল্পের মোচড় যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক ততটাই গুরুত্বপূর্ণ এটি কোন চরিত্রের চোখে দর্শক দেখছেন।
ছবির একটি বড় অংশ আলিনার (পার্বতী থিরুভোথু) দৃষ্টিভঙ্গিতে এগিয়ে যায়। তিনি সদ্য বিধবা হয়েছেন এবং স্বামীর মৃত্যুর পর পুলিশের চাকরি পান। আলিনার ছোট একটি মেয়ে রয়েছে, যে তাঁর বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। প্রশিক্ষণ শেষ করে নতুন থানায় দায়িত্ব নিতে এসে আলিনার পরিচয় হয় জ্যেষ্ঠ কনস্টেবল দিব্যার (উন্নিমায়া প্রসাদ) সঙ্গে, যিনি একাধিকবার চেষ্টা করেও মা হতে পারেননি। অন্যদিকে দাসন (সিদ্ধার্থ ভরতন) ও শ্রীনাথের (ম্যাথু থমাস) জীবনেও নতুন অধ্যায় শুরুর অপেক্ষা ছিল। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর তাঁরা জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এই পুলিশ কর্মকর্তাদের জীবনযাপন এবং কর্মস্থলের সবকিছুতেই এক ধরণের সাধারণত্বের ছাপ রয়েছে। তাঁরা সিনেমার সেই চেনা নিখুঁত বা আদর্শবান পুলিশ নন, বরং তাঁদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিবাদে জড়াতে দেখা যায় এবং তাঁরা অত্যন্ত সাধারণভাবেই দৈনন্দিন দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু এই চারজন যখন এমন একটি ভুল করে বসেন, যার পরিণতি তাঁদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখনই গল্পের মোড় ঘোরে।
নৈতিকতা এবং আইনের মধ্যকার যে সূক্ষ্ম সীমারেখা, সেটিই ‘প্রধমা দৃষ্টিয়া কুট্টাকার’কে একটি দুর্দান্ত সিনেমায় পরিণত করেছে। এখানে ভুল হওয়ার যে আশঙ্কা থাকে, শেষ পর্যন্ত তার প্রায় সবই ঘটে। তবে এই সিনেমায় ‘দৃশ্যম’–এর জর্জকুট্টির মতো কোনো অসাধারণ বুদ্ধিমান বা ঠান্ডা মাথার পরিকল্পনাকারী নেই। এই চার পুলিশ কর্মকর্তা যে ব্যবস্থার অংশ, সেই ব্যবস্থাকে নিজেদের সুবিধামতো ব্যবহার করার কৌশলেও তাঁরা খুব একটা দক্ষ নন। তবে নিজেদের কাজের পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে এবং সামনে কী অপেক্ষা করছে, তা বোঝার মতো জ্ঞান তাঁদের আছে। এই উপলব্ধিই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ঠিক এই সময়েই গল্পে প্রবেশ করেন তারকা পুলিশ কর্মকর্তা হ্যারিস মিরান (বিজয়ারাঘবন)।
আগের চরিত্রগুলোকে দেখে যদি মনে হয় যে তাঁরা প্রচলিত পুলিশি সিনেমার উপযুক্ত নায়ক নন, তবে মিরান ঠিক সেই ধরণের একজন কর্মকর্তা, যাঁকে কেন্দ্র করেই সাধারণত এ ধরণের সিনেমা তৈরি হয়। একদিকে ভুল করে বিপাকে পড়া সাধারণ কয়েকজন পুলিশ সদস্য, আর অন্যদিকে অভিজ্ঞতা ও সুনামের অধিকারী এক আদর্শ পুলিশ কর্মকর্তা। এই দুই বিপরীত মেরুর সংঘাতই ছবির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হয়ে উঠেছে—এখানে ‘ভালো’ পুলিশ সদস্যদের মুখোমুখি হতে হয় সেরা পুলিশ কর্মকর্তার।
শুরুতে মিরানকে একজন আদর্শবান পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে দেখানো হয়েছে, যিনি নিয়ম মেনেই কাজ করেন। কিন্তু মামলাটি যত সামনে আসে, তাঁর নৈতিক দৃঢ়তায় ফাটল ধরতে শুরু করে। যেকোনো ভালো পুলিশি থ্রিলারের মতো এখানেও অহং একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর সাথে যুক্ত হয় পদমর্যাদাজনিত অস্বস্তি। নিজের চেয়ে অনেক ছোট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে যে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, তা মিরানের বিচারবুদ্ধিকে প্রভাবিত করে।
পরিচালক শাহাদের আগের ছবি ‘প্রকাশন পারাক্কাট্টে’ খুব একটা সাড়া ফেলতে পারেনি। তবে নতুন এই ছবিতে তিনি নিজের নির্মাণশৈলীকে অনেক বেশি শাণিত করেছেন। প্রায় তিন ঘণ্টার দৈর্ঘ্য হওয়া সত্ত্বেও কাহিনি অধিকাংশ সময় দর্শককে ধরে রাখতে সক্ষম হয়। মাঝেমধ্যে গল্প এগিয়ে নিতে চিত্রনাট্যে কিছু সুবিধাজনক পরিস্থিতির আশ্রয় নেওয়া হলেও তা সামগ্রিক রোমাঞ্চ নষ্ট করে না। চিত্রনাট্যকার পি এস সুব্রামানিয়ান ও বিজেশ থোত্তিঙ্গাল এমন এক অতিবাস্তবধর্মী পুলিশি থ্রিলার নির্মাণ করেছেন, যা দর্শককে বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ দেয় না, বরং সব সময় অস্বস্তিতে রাখার পণ করে এগিয়ে চলে।
গল্পের একটি চরিত্রের লেখা বইকে সিনেমার কাহিনির অগ্রগতিতে যেভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, তা অত্যন্ত চমৎকার। এটি কেবল একটি উপকরণ হিসেবে নয়, বরং রহস্যের স্তর উন্মোচনেও বড় ভূমিকা রাখে। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ, থানার ভেতরের উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশ এবং তদন্তের নানা মোচড়ের মাঝে চিত্রনাট্যকারেরা বুদ্ধিমত্তার সাথে হাস্যরসের ব্যবহার করেছেন। ফলে ছবির গাম্ভীর্য কিছুটা হালকা হলেও মূল রহস্যের গুরুত্ব কমে যায়নি।
অভিনয়ের ক্ষেত্রে পার্বতী এই ছবির আবেগের কেন্দ্রবিন্দু। নতুন পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে তাঁর চরিত্রে সতর্কতা ও অনভিজ্ঞতার ছাপ যেমন আছে, তেমনি প্রতিকূল পরিস্থিতিতে টিকে থাকার দৃঢ়তাও ফুটে উঠেছে। এই দুই দিকের ভারসাম্য তিনি বিশ্বাসযোগ্যভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। অন্যদিকে হ্যারিস মিরান চরিত্রে বিজয়ারাঘবন পর্দায় এমন এক তদন্তকারীর উপস্থিতি তৈরি করেছেন, যাঁর সামনে নিখুঁত অপরাধও শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ে যেতে পারে বলে মনে হয়।
মালয়ালম সিনেমার অনেক পুলিশি তদন্তনির্ভর ছবিতে যখন একই ধরণের গল্প বলার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তখন ‘প্রধমা দৃষ্টিয়া কুট্টাকার’ সেই ধারায় নতুনত্ব নিয়ে এসেছে। এটি এমন এক শ্বাসরুদ্ধকর সিনেমা, যেখানে প্রায় প্রত্যেকের নৈতিক অবস্থানই প্রশ্নবিদ্ধ। তা সত্ত্বেও দর্শক হিসেবে কোনো না কোনো পক্ষ বেছে নিতে মন চায়। কখনো মনে হয় রহস্য ও পরিণতি সম্পর্কে সব বুঝে ফেলেছি, কিন্তু সিনেমাটি বারবার বুঝিয়ে দেয় যে দর্শকের ধারণার চেয়ে গল্পটি কয়েক ধাপ এগিয়ে। ‘দৃশ্যম’–এর সঙ্গে তুলনায় যাওয়ার দরকার নেই, থ্রিলার–ভক্ত হলে এই সিনেমা মিস করবেন না।