নিভিন পাউলি ও মামিথা বাইজুর অভিনীত রোমান্টিক কমেডি চলচ্চিত্র ‘বেথলেহেম কুদুম্বা ইউনিট’ বক্স অফিসে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করে মালয়ালম সিনেমার ইতিহাসে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। জনপ্রিয় সিনেমা ‘লোকা’-র আয়ের রেকর্ড ভেঙে এখন এই ছবিটি মালয়ালম চলচ্চিত্রের সর্বকালের সর্বোচ্চ আয় করা সিনেমা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। পরিচালকের অনন্য গল্প বলার শৈলী, দর্শকদের ইতিবাচক মুখে মুখে প্রচার এবং আন্তর্জাতিক বাজারের ব্যাপক চাহিদার সমন্বয়ে ছবিটি এখন সাফল্যের এক অনন্য উদাহরণ। মাত্র ২৫ কোটি রুপি নির্মাণব্যয়ে নির্মিত এই সিনেমাটি বিশ্বজুড়ে ৩৩০ কোটি রুপির বেশি আয় করেছে, যা আয়-ব্যয়ের অনুপাতে প্রায় ১৩ গুণ। সম্প্রতি ওটিটি প্ল্যাটফর্মে মুক্তির পর বাংলাদেশেও সিনেমাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ৯ অক্টোবরের এক প্রতিবেদনে বিস্তারিত জানিয়েছে, ছবিটির বিশ্বব্যাপী মোট আয় দাঁড়িয়েছে ৩৩০ কোটি ৯৩ লাখ রুপি। এর মধ্যে ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে এসেছে ১৯২ কোটি ৪৮ লাখ রুপি এবং আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আয় হয়েছে ১৩৮ কোটি ৪৫ লাখ রুপি। ভারতের নেট আয়ের পরিমাণ ১৬৪ কোটি ৯১ লাখ রুপি।
এই অভাবনীয় সাফল্যের মূলে রয়েছে সাধারণ মানুষের জীবনঘনিষ্ঠ গল্প। পরিচালক গিরিশ এডি-র নির্দেশনায় প্রধান দুই চরিত্রে অভিনয় করেছেন নিভিন পাউলি ও মামিথা বাইজু। ছবির কাহিনীতে প্রেম, সংকোচ, বয়সের ব্যবধান এবং সম্পর্কের জটিলতাকে অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। প্রচলিত রোমান্টিক সিনেমার মতো এখানে নায়ককে সবসময় আত্মবিশ্বাসী বা পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রক হিসেবে দেখানো হয়নি। বরং তার দ্বিধা, অস্বস্তি এবং সাধারণ মানুষের মতো আচরণই গল্পের মূল আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। গিরিশ এডির সিনেমার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো পরিচিত জীবনের কাছাকাছি থাকা চরিত্র ও পরিস্থিতি। তাঁর সিনেমার চরিত্রগুলো সবসময় জানেন না কী করতে হবে; তারা প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হন, বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন এবং ছোটখাটো ঘটনা থেকে হাস্যরসের জন্ম দেন। পরিচালকের পূর্ববর্তী চলচ্চিত্র ‘থান্নির মাথান দিনাঙ্গাল’, ‘সুপার শরন্যা’ ও ‘প্রেমালু’-তেও এই ধরনের বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা গেছে।
এই ঘরানার চলচ্চিত্রে বড় কোনো নাটকীয় মোড়ের চেয়ে চরিত্রের আচরণ, সংলাপ এবং সম্পর্কের সূক্ষ্মতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে দর্শক চরিত্রগুলোর মধ্যে নিজেদের পরিচিত মানুষকে খুঁজে পান। বিশ্লেষকদের মতে, গিরিশের সিনেমায় এই পরিচিতির অনুভূতি হাস্যরসের পাশাপাশি আবেগও তৈরি করে, যা ‘বেথলেহেম কুদুম্বা ইউনিট’-এর সাফল্যে বড় ভূমিকা রেখেছে।
মালয়ালম সিনেমার জনপ্রিয় রোমান্টিক নায়ক নিভিন পাউলি তাঁর ক্যারিয়ারের সাম্প্রতিক উত্থান-পতনের পর এই ছবিতে এক ভিন্নধর্মী চরিত্রে ফিরে এসেছেন। পরিচালক গিরিশ তাঁকে এমন এক চরিত্রে ফুটিয়ে তুলেছেন, যিনি অতিমানবীয় নন। তাঁর স্বাভাবিকতা এবং লাজুক আচরণই দর্শকদের কাছে তাঁকে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। ছবিতে নিভিনের চরিত্র ‘জাস্টিন’ একজন ত্রিশোর্ধ্ব ক্যাটারার। তিনি পেশাগতভাবে দক্ষ এবং নির্ভরযোগ্য মানুষ হলেও প্রেমের ক্ষেত্রে বেশ আত্মবিশ্বাসহীন। পাশের বাড়ির কলেজপড়ুয়া এক তরুণী তাঁর প্রতি আগ্রহ দেখালে তিনি পরিস্থিতি সামলাতে হিমশিম খান। বয়সের ব্যবধান নিয়ে তৈরি এই রোমান্টিক গল্পটি শুধু প্রেমের আকর্ষণে সীমাবদ্ধ না থেকে সম্পর্কের সীমারেখা এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার বিষয়গুলোকেও সামনে এনেছে।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পরিচালক গিরিশের বক্তব্যের সারমর্ম ছিল, “এমন চরিত্রকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে হলে তার আচরণে স্বাভাবিকতা থাকা জরুরি। নায়ক যদি প্রতিটি পরিস্থিতিতে প্রচলিত রোমান্টিক সিনেমার মতো আচরণ করেন, তাহলে গল্পের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হতে পারে।” নিভিনের অভিনয়ে সেই মানবিক দিক ও অস্বস্তি ফুটে ওঠায় চরিত্রটি দর্শকদের কাছে স্বতন্ত্র হয়ে উঠেছে।
ছবির অন্যতম আকর্ষণ অভিনেত্রী মামিথা বাইজু। তরুণ প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয় এই অভিনেত্রী প্রেমের উদ্যোগ নেওয়া এবং সম্পর্কের সমীকরণ বদলে দেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ফুটিয়ে তুলেছেন। নিভিন ও মামিথার পর্দার রসায়ন ছবিটির রোমান্টিক কমেডির আবহ তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। এছাড়া অভিনয় করেছেন বিনয় ফোর্ট, সুরেশ কৃষ্ণ, শ্যাম মোহন ও শ্রিন্দা।
বাজেট প্রসঙ্গে পরিচালক গিরিশ এডি সম্প্রতি ক্লাব এফএম-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, ছবিটির নির্মাণে খরচ হয়েছে প্রায় ২৫ কোটি রুপি। তাঁর মতে, বর্তমান মালয়ালম সিনেমার বাস্তবতায় এই বাজেট খুব বড় নয়। একসময় ১০ কোটি রুপির বাজেটকেও বড় মনে করা হতো, যা এখন স্বাভাবিক। তিনি আরও জানান, হঠাৎ করে বিপুল বাজেটের সিনেমা বানানোর পরিকল্পনা তাঁর নেই; বড় বাজেটের ছবি করলেও তা যেন গল্প ও তারকার উপযোগী হয়, সেটিই তাঁর মূল ভাবনা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারত থেকে ১৯২ কোটি ৪৮ লাখ রুপি এবং বিদেশ থেকে ১৩৮ কোটি ৪৫ লাখ রুপি গ্রস আয় করেছে ছবিটি। মালয়ালম ভাষার পাশাপাশি তামিল ও তেলুগু সংস্করণে মুক্তির কৌশলটি আয়ের পরিধি বাড়াতে সহায়ক হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
তবে এই বিপুল আয়ের সবটুকু প্রযোজকের পকেটে যায় না বলে ব্যাখ্যা দিয়েছেন সহপ্রযোজক অভিনেতা ফাহাদ ফাসিল। কিউ স্টুডিওকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আলোচনায় যে ৩০০ কোটির বেশি আয়ের কথা বলা হচ্ছে, তার অর্ধেকও প্রযোজকদের হাতে আসবে না।” তিনি স্পষ্ট করেন যে, এই অঙ্কটি ছবির মোট গ্রস আয়, যা প্রযোজকের নিট মুনাফা নয়। গালফ নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিদেশি এজেন্ট, পরিবেশক, প্রেক্ষাগৃহের অংশ এবং জিএসটি (পণ্য ও পরিষেবা কর) বাদ দেওয়ার পর প্রযোজকরা বাকি অর্থ পান। ছবিটি প্রযোজনা করেছে ভাবনা স্টুডিওস, যার সঙ্গে ফাহাদ ফাসিল ছাড়াও যুক্ত আছেন দিলীশ পোথান ও শ্যাম পুষ্করন।
এর আগে মালয়ালম সিনেমার সর্বোচ্চ আয়ের রেকর্ড ছিল ডমিনিক অরুণ পরিচালিত ও কল্যাণী প্রিয়দর্শন অভিনীত সুপারহিরো সিনেমা ‘লোকা চ্যাপ্টার ১: চন্দ্র’-র দখলে। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের তথ্যমতে, ছবিটি বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩০১ কোটি ৪১ লাখ রুপি আয় করেছিল। গিরিশের নতুন ছবিটি সেই রেকর্ড ভেঙে শীর্ষে অবস্থান করছে। সর্বোচ্চ আয়ের তালিকায় আরও রয়েছে ‘এল২: এম্পুরান’ (২৬৬ কোটি ৮১ লাখ রুপি), ‘মঞ্জুমেল বয়েজ’ (২৪১ কোটি ৩ লাখ রুপি) এবং ‘দৃশ্যম ৩’ (২৩৯ কোটি ৮৩ লাখ রুপি)।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের মতে, গিরিশ এডির সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হলো তাঁর সহজ গল্প বলার ধরন। তাঁর ছবির গল্প জটিল হয় না, বরং দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট ঘটনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। দর্শক প্রথমে ছবিটি দেখেন এবং তারপর অন্যদের দেখার পরামর্শ দেন, যার ফলে মুখে মুখে প্রচারের মাধ্যমে আগ্রহ ছড়িয়ে পড়ে। পরিচালকের আগের ছবি ‘প্রেমালু’ আনুমানিক ৮ থেকে ১০ কোটি রুপি বাজেটে নির্মিত হয়ে ১৩০ কোটি রুপির বেশি আয় করেছিল। ‘থান্নির মাথান দিনাঙ্গাল’ ও ‘সুপার শরন্যা’ও তাঁর পরিচিতি বৃদ্ধিতে সাহায্য করেছে।
সাফল্যের আরেকটি বড় কারণ হলো মালয়ালম ভাষাভাষী প্রবাসী দর্শক। কেরালমের বাইরে বসবাসকারী প্রবাসীদের কাছে পর্দায় পরিচিত শহর, পাড়া ও পারিবারিক সম্পর্কের রসবোধ এক আলাদা আনন্দ দেয়। পাশাপাশি তামিল ও তেলুগু সংস্করণ বৃহত্তর দর্শকগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে সাহায্য করেছে। তবে অভিনয়, নির্মাণ এবং সঠিক সময়ে মুক্তিও এই বক্স অফিস সাফল্যের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।