কাগজে-কলমে যে প্রকল্পের মেয়াদ ছিল মাত্র দেড় বছর, সাত বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও তা শেষ না হওয়া কেবল ঠিকাদারের অবহেলা নয়, বরং এটি আমাদের উন্নয়ন তদারকি ব্যবস্থার চরম অব্যবস্থাপনার এক প্রকট নজির। নেত্রকোনা শহরের তীব্র যানজট নিরসন এবং হাওরাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের পথ সুগম করার লক্ষ্যে ২৯৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৩ দশমিক ২ কিলোমিটার দীর্ঘ বাইপাস সড়ক নির্মাণের উদ্যোগটি আজ জনদুর্ভোগের এক দীর্ঘ প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
২০১৯ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদিত এই সড়কটি ২০২১ সালের জুনে চালু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তব চিত্র অত্যন্ত হতাশাজনক; এ পর্যন্ত তিন দফা মেয়াদ বাড়ানো হলেও কাজ শেষ হয়নি। উল্টো এখন চতুর্থ দফায় মেয়াদ বাড়ানোর তোড়জোড় চলছে। প্রকল্পের মোট চারটি প্যাকেজের মধ্যে দুটির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে থাকলেও একটি প্যাকেজের অগ্রগতি ৪৫ শতাংশের নিচে এবং অন্যটির কাজ এক-তৃতীয়াংশও স্পর্শ করেনি।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) ভাষ্যমতে, কাজের গতি বাড়ানোর তাগিদ দিয়ে ঠিকাদারদের অন্তত ১২ বার চিঠি পাঠিয়ে সতর্ক করা হয়েছে। নিয়মিত বিল পরিশোধ করা সত্ত্বেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘জামিল ইকবাল’ কাজ ঝুলিয়ে রেখেছে। তবে এখানে বড় প্রশ্নটি হলো, ১২ বার চিঠি দেওয়ার পরও যখন কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হলো না, তখন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চুক্তি বাতিল এবং জামানত বাজেয়াপ্ত করার মতো কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে কেন এত দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করা হলো?
এই বাইপাস সড়কটি চালু হলে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুরি, বারহাট্টা, কলমাকান্দাসহ সুনামগঞ্জের তাহিরপুর, মধ্যনগর ও ধর্মপাশার সব দূরপাল্লার ও ভারী যানবাহন শহরের ভেতর প্রবেশ না করে বিকল্প পথে যাতায়াত করতে পারত। কিন্তু এই বাইপাস সড়কের অনুপস্থিতির কারণে শহরের সংকীর্ণ সড়কগুলো দিয়ে এসব ভারী যানবাহন চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছে, যার ফলে প্রধান মোড়গুলোতে নিত্যদিনের স্থবিরতা দেখা দিচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপদ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
কেবল কাজ ঝুলে থাকাই নয়, নির্মাণকাজের মান নিয়েও উঠেছে নানা গুরুতর প্রশ্ন। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সেতু ও কালভার্টগুলো প্রয়োজনের তুলনায় নিচু করে নির্মাণ করা হচ্ছে এবং সড়কের উচ্চতাও সঠিকভাবে দেওয়া হচ্ছে না। এর পাশাপাশি জমি অধিগ্রহণের টাকা পাওয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং ঠিকাদারদের ফেলে রাখা বালু ও পাথরের কারণে বর্ষাকালে নতুন করে সংকট তৈরি হচ্ছে।
প্রকৃত উন্নয়ন মানে কেবল প্রকল্প অনুমোদন কিংবা শত শত কোটি টাকার বাজেট প্রণয়ন নয়; বরং নির্দিষ্ট সময়ে গুণগত মান বজায় রেখে কাজ বুঝিয়ে দেওয়াই হলো প্রকৃত উন্নয়ন। বারবার মেয়াদ বাড়িয়ে জনগণের অর্থের অপচয় এবং ধৈর্যের পরীক্ষা নেওয়া এখন বন্ধ করতে হবে। চুক্তি ভঙ্গকারী ঠিকাদারকে কালো তালিকাভুক্ত করা এবং তদারকিতে গাফিলতি থাকা কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় এনে অনতিবিলম্বে বাইপাস সড়কটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা এখন সময়ের দাবি।