কুমিল্লা নগরীর টমছমব্রিজ-কোটবাড়ি বিশ্বরোড সড়কটি বর্তমানে চালক, যাত্রী এবং পথচারীদের জন্য এক আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। অসংখ্য খানাখন্দ আর বড় বড় গর্তের কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটি এখন পুরোপুরি বেহাল। প্রতিদিন চরম ঝুঁকি নিয়ে এই পথ দিয়ে চলাচল করছেন হাজারো শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী ও পর্যটক। তবে এরই মধ্যে সড়কের কয়েকটি নির্দিষ্ট স্থানে ঢালাইয়ের কাজ শুরু হয়েছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগ জানিয়েছে, আগামী ডিসেম্বর নাগাদ পুরো সড়কে পিচ ঢালাইয়ের কাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, টমছমব্রিজ থেকে কোটবাড়ি মোড় পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কের বিভিন্ন অংশে ছোট-বড় অসংখ্য গর্ত তৈরি হয়েছে। কোথাও পিচ উঠে গেছে, আবার কোথাও ইট-পাথরের খোয়া উঠে সড়কজুড়ে খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। এসব গর্তের কারণে যানবাহন চলাচলে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রে গর্ত এড়িয়ে চলতে গিয়ে চালকদের জীবন ঝুঁকি নিতে হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রায় তিন বছর ধরে সড়কটি এই বেহাল অবস্থায় পড়ে আছে। মাঝেমধ্যে ভাঙা অংশে ইট ও কংক্রিট ফেলা হলেও তা কোনো স্থায়ী সমাধান বয়ে আনেনি। বরং বৃষ্টির পানিতে সেই উপকরণগুলোও তলিয়ে গেছে, যার ফলে প্রতিদিনের যাতায়াত এখন চরম দুর্ভোগে পরিণত হয়েছে।

হাজারো শিক্ষার্থীর যাতায়াত, পর্যটকদেরও ভোগান্তি

কুমিল্লার শিক্ষা, প্রশাসন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটন খাতের জন্য টমছমব্রিজ-কোটবাড়ি সড়কটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সড়কটি ব্যবহার করে প্রতিদিন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, পল্লি উন্নয়ন একাডেমি (বার্ড), কুমিল্লা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট, কুমিল্লা সিটি কলেজ, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ, কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ড সরকারি মডেল কলেজ, কুমিল্লা ইস্পাহানি স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং বাংলাদেশ আর্মি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা যাতায়াত করেন।

এছাড়া কুমিল্লা সেনানিবাস, বিজিবি সেক্টর হেডকোয়ার্টার্স, র‍্যাব কার্যালয়, সার্ভে ইনস্টিটিউট, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর আঞ্চলিক কার্যালয়সহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালে যাতায়াতের জন্য এটি অন্যতম প্রধান পথ।

কুমিল্লার প্রত্নতাত্ত্বিক ও পর্যটনকেন্দ্র ময়নামতি জাদুঘর, শালবন বৌদ্ধবিহারসহ কোটবাড়ি এলাকার বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে যেতে দেশি-বিদেশি পর্যটকরাও এই সড়কটি ব্যবহার করেন। গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কের বর্তমান দুরবস্থার কারণে শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সাধারণ যাত্রী ও পর্যটকদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

গর্তে পড়ে নষ্ট হচ্ছে যানবাহনের যন্ত্রাংশ

সড়কের এই শোচনীয় অবস্থা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন হালিমানগর ও দৌলতপুর মোড় এলাকার বাসিন্দারা। কোটবাড়ি এলাকার সিএনজিচালক খাইরুলসহ কয়েকজন চালক জানান, গাড়িতে যাত্রী উঠলে সড়কের অবস্থা নিয়ে তাদের প্রতিনিয়ত কথা শুনতে হয়। প্রতিদিন গর্তে পড়ে গাড়ির কোনো না কোনো যন্ত্রাংশ নষ্ট হচ্ছে।

তারা বলেন, “মাঝখানে সড়কের ভাঙা অংশে কিছু ইট ও কংক্রিট ফেলা হয়েছিল। কিন্তু বৃষ্টির পানিতে সেগুলোও তলিয়ে গেছে। এতে দুর্ভোগ কমেনি। বরং ঝুঁকি নিয়ে গাড়ি চালাতে হচ্ছে, বাড়ছে মেরামত খরচও।”

দুর্ভোগের অবসান চান স্থানীয়রা

দীর্ঘদিনের এই ভোগান্তি থেকে মুক্তি পেতে সড়কটির সংস্কারকাজ দ্রুত শেষ করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষার্থী ও যানবাহনের চালকেরা। তাদের মতে, গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কের বেহাল দশার কারণে প্রতিদিন সময় ও অর্থ নষ্ট হচ্ছে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।

সংসদ সদস্যের নির্দেশনার পর শুরু হয়েছে কাজ

গত ১৩ আগস্ট কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী সড়কটি পরিদর্শন করেন। সেই সময়ে তিনি দ্রুত সংস্কারকাজ সম্পন্ন করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন।

সড়ক ও জনপথ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, টমছমব্রিজ থেকে কোটবাড়ি মোড় পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার সড়কের সাত থেকে আটটি স্থানে ঢালাইয়ের কাজ শুরু হয়েছে। একটি নির্দিষ্ট স্থানের কাজ শেষ করে পর্যায়ক্রমে অন্য স্থানে কাজ করা হচ্ছে এবং বাকি অংশের কাজও শুরু হবে। আগামী ডিসেম্বর নাগাদ টমছমব্রিজ থেকে পুরো সড়কে পিচ ঢালাইয়ের কাজ শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে।

কুমিল্লা সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মোহাম্মদ আদনান ইবনে হাসান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “কাজের কোনো ধীরগতি নেই। একটি স্পটের ঢালাইয়ের কাজ শেষ করে আরেকটি স্পটে কাজ শুরু করা হয়েছে। বাকি সড়কের কাজও শুরু হবে।”