রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলায় জমি সংক্রান্ত দীর্ঘমেয়াদী বিরোধের জেরে সাংবাদিক ইজাজ সৌমিকের পরিবারের পৈতৃক জমিতে জোরপূর্বক গাছ কাটার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা সুজন মৃধা ও তার ভাইদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ আনা হয়েছে। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুলিশ গাছ কাটার কাজ বন্ধ করে দেয়। এই ঘটনার ফলে জমির মালিকানা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যকার বিরোধ পুনরায় সামনে এসেছে।

গত মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকালে উপজেলার যশাই ইউনিয়নের ভেল্লাবাড়িয়া গ্রামে এই ঘটনাটি ঘটে। ভুক্তভোগী ইজাজ সৌমিক বর্তমানে চ্যানেল ২৪-এর সিনিয়র রিপোর্টার হিসেবে কর্মরত আছেন।

অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ভেল্লাবাড়িয়া গ্রামের মৃত বাদশাহ মিঞার সন্তানদের সঙ্গে সুজন মৃধা ও তার ভাইদের জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ চলে আসছে। ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, সম্প্রতি ওই জমির গাছ কেটে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার সকালে সুজন মৃধাসহ কয়েকজন লোক নিয়ে জমিতে থাকা গাছ কাটতে যান। তবে পুলিশ সময়মতো ঘটনাস্থলে পৌঁছে গাছ কাটার কাজ বন্ধ করে দেয়।

অভিযুক্তদের তালিকায় রয়েছেন সুজন মৃধা, তুর্কি মৃধা, টিপু মৃধা, পলাশ মৃধা ও মিঠু। এদের মধ্যে সুজন, তুর্কি, টিপু ও পলাশ হলেন মৃত হামিদুর রহমান মজনু মৃধার সন্তান।

সাংবাদিকের বড় ভাই মিজানুর রহমান অভিযোগ করে জানান, পরিবারের সদস্যরা বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করায় বাড়িতে কেউ থাকেন না, সেখানে একজন কেয়ারটেকার রয়েছেন। প্রতিপক্ষ এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে জমিতে থাকা গাছ কাটতে যান। তার দাবি, ইতোমধ্যে অন্তত ১০টি গাছ কেটে নেওয়া হয়েছে এবং প্রায় ২০ শতাংশ জমি দখল করে রাখা হয়েছে।

তিনি বলেন, “নিজের হাতে জমিতে গাছগুলো লাগিয়েছি। কয়েক দিন আগে গাছ কাটার হুমকি দেওয়া হয়েছিল, যার অডিও রেকর্ড রয়েছে। মঙ্গলবার সকালে লোকজন নিয়ে এসে গাছ কাটা শুরু করেন তারা। পরে বিষয়টি জানতে পেরে স্থানীয় সংসদ সদস্যের নির্দেশনায় ওসি পুলিশ পাঠিয়ে গাছ কাটা বন্ধ করেন।”

মিজানুর রহমান আরও অভিযোগ করেন যে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জমি দখলকে কেন্দ্র করে তার বড় ভাই মফিজুর রহমানের ওপর হামলা চালানো হয়েছিল এবং ওই ঘটনায় তিনি আহত হন। তার ভাষ্যমতে, এর আগে থানা থেকে মৌখিকভাবে জানানো হয়েছিল যে, বাড়ির জমি ভাগ না হওয়া পর্যন্ত কোনো পক্ষই গাছ কাটতে পারবে না এবং সবাইকে নিজ নিজ অবস্থানে থাকতে হবে।

স্থানীয় বাসিন্দা ফজলু শেখ জানান, “আমরা অনেক আগে থেকেই দেখে আসছি, এই জমি মৃত বাদশাহ মিঞার সন্তানরা ভোগদখল করে আসছেন। তবে এখন সুজন মৃধা জোরপূর্বক গাছ কেটে নিচ্ছেন।”

আরেক স্থানীয় বাসিন্দা শিলা আক্তারও জমিটি বাদশাহ মিঞার সন্তানদের বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, তারা কর্মসূত্রে ঢাকায় থাকেন এবং এই সুযোগে জমির গাছ কেটে নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া অতীতে সুজন মৃধার বিরুদ্ধে তাকে ও তার স্বামীকে মারধর এবং মামলা দিয়ে হয়রানির অভিযোগও জানান তিনি।

এদিকে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীর অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সুজন মৃধা প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্নভাবে মানুষকে হয়রানি করেছেন। তাদের দাবি, জমি দখল ও মামলা দিয়ে হয়রানির মতো কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে আগে থেকেই রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অভিযোগ অস্বীকার না করে সুজন মৃধা বলেন, “জমি আমাদের দুজনেরই। তবে আমার অংশ বেশি। গাছগুলো আমার অংশে রয়েছে, তাই আমি গাছ কাটতে গিয়েছিলাম। কিন্তু থানা-পুলিশ ও স্থানীয় একজন নেতা বলেছেন, গাছ কাটা যাবে না। আগে বসে আলোচনা বা সালিশের মাধ্যমে সমাধান করা হবে। তাই আমি গাছ কাটা বন্ধ করে দিয়েছি।”

তবে গাছ কাটার বিষয়ে আগে নিষেধাজ্ঞা থাকার কথা উল্লেখ করে তা সত্ত্বেও কেন তিনি গাছ কাটতে গিয়েছিলেন—এ প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব দেননি সুজন মৃধা।

এই বিষয়ে পাংশা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মঈনুল ইসলাম বলেন, “গাছ কাটার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। সেখানে একটি মেহগনি গাছের ডাল কাটা অবস্থায় দেখা যায়। পরে গাছ কাটার কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় দুই পক্ষকেই থানায় ডাকা হয়েছে। আলোচনার মাধ্যমে জমি নিয়ে বিরোধের সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।”