জীবনে যারা বারবার ব্যর্থ হয়েছেন, যাদের কথা কেউ মনে রাখে না বা যাদের প্রতি সমাজের ভ্রুক্ষেপ নেই, আজকের দিনটি মূলত তাদেরই। আজ ১৩ অক্টোবর, ক্যালেন্ডারের পাতায় এই দিনটি চিহ্নিত করা হয়েছে ‘ব্যর্থতা দিবস’ হিসেবে। তাই ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে মন খারাপ করার কোনো অবকাশ নেই, কারণ আজকের দিনটি আমাদের মতো ব্যর্থ মানুষদের জন্য উৎসর্গ করা।
সাধারণত এই পৃথিবী কেবল সফল ব্যক্তিদেরই মূল্যায়ন করে। সফলদের জীবন নিয়ে লেখা হয় কবিতা, গান এবং প্রবন্ধ। তারা কী ধরনের খাবার গ্রহণ করেন, কী পোশাক পরেন, কোন বইগুলো তাদের প্রিয় কিংবা সাফল্যের শিখরে পৌঁছানোর রহস্য কী—তা জানতে সাধারণ মানুষের প্রবল আগ্রহ থাকে। উদাহরণস্বরূপ বিল গেটসের কথা বলা যায়। তিনি কোন বই পড়েন কিংবা তাঁর চিন্তাভাবনা কেমন, তা প্রায়ই খবরের শিরোনাম হয়ে থাকে। এমনকি তাঁর জন্মদিনে শুভেচ্ছার ভিড়ে তিনি প্রায় ক্লান্ত হয়ে পড়েন।
অন্যদিকে, আমার মতো যারা ব্যর্থ, জীবনে বারবার হোঁচট খেয়েছেন, তাঁদের প্রতি কেউ তেমন মাথা ঘামান না বা গুরুত্ব দেন না। তবে মন খারাপ করার কিছু নেই, কারণ আজ ১৩ অক্টোবর ‘ব্যর্থতা দিবস’।
এই বিশেষ দিবসের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১০ সালে ফিনল্যান্ডে। ফিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ২০১৭ সালের ১১ অক্টোবর এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ব্যর্থতার ভয় কাটিয়ে ওঠার বিষয়টিই এই দিবসের প্রধান লক্ষ্য। নতুন কিছু করার চেষ্টা করলে ভুল হতে পারে, এমনকি ব্যর্থতাও আসতে পারে। কিন্তু ব্যর্থ হওয়ার ভয়ে যদি কেউ চেষ্টা করা ছেড়ে দেয়, তবে সে নতুন কিছু শেখার সুযোগটি চিরতরে হারিয়ে ফেলে। তাই ব্যর্থতাকে লজ্জার বিষয় হিসেবে না দেখে, বরং ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে পুনরায় চেষ্টা করার মানসিকতা তৈরি করাই এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য।
অবশ্য এই বিষয়ে নানা তর্কবিতর্ক থাকতে পারে, তবে এটিই বাস্তব সত্য যে সাফল্যের পাশাপাশি ব্যর্থতার অস্তিত্ব থাকে। ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা ছাড়া প্রকৃত সফলতা অর্জন করা অসম্ভব। সব বাধা ও ব্যর্থতাকে জয় করে নিজেদের স্বপ্নের গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাওয়াই এই দিবসের অন্তর্নিহিত লক্ষ্য।
আজকের দিনে টাকা-পয়সা কিংবা পদ-পদবির মাপকাঠিতে সাফল্যের হিসাব না করে বরং ভিন্নভাবে ব্যর্থতার হিসাব করা যাক। মিলিয়ে দেখুন তো, আমার মতো আপনিও ব্যর্থ কি না। আমি কত নম্বর পেয়েছি তা বলছি, তবে তার আগে জানিয়ে রাখি, প্রতিটি সঠিক উত্তরের জন্য নম্বর ১।
১. অনেকবার পরিকল্পনা করেছেন যে কাল ভোরে ঘুম থেকে উঠে নিয়মিত হাঁটতে যাবেন। প্রথম দিন সকালে উঠে হাঁটতে গিয়ে নিজেকে নিয়ে গর্ব করেছেন এবং ভেবেছেন—পারব না মানে, অবশ্যই পারব! দ্বিতীয় দিন অ্যালার্ম বন্ধ করে কিছুটা বাড়তি ঘুমিয়ে তারপর হাঁটতে গেছেন। তৃতীয় দিন পরিকল্পনা বদলে ঠিক করেছেন, আজকের দিনটা থাক, কাল থেকে শুরু করবেন। কিন্তু সেই কাঙ্ক্ষিত কাল আর আসেনি।
২. মাসের শেষ দিকে পকেটে টাকা না থাকায় অফিসে বা ক্যাম্পাসে হেঁটে গেছেন। সিদ্ধান্ত নিলেন, সামনের মাস থেকে খুব মেপে খরচ করবেন। প্রথম এক সপ্তাহ ঠিকঠাক চললেও পরে মন বেঁকে বসল। ঠিক করলেন, এই মাস থাক, সামনের মাস থেকে আর এক টাকাও অযথা খরচ করবেন না।
৩. পড়তে বসে ভেবেছেন, মাত্র পাঁচ মিনিট ফেসবুক দেখে আবার পড়াশোনায় ফিরবেন। কিন্তু কখন যে সেই পাঁচ মিনিট এক ঘণ্টায় পরিণত হলো, তা বুঝতেই পারেননি।
৪. কাউকে টাকা ধার দিয়েছেন, কিন্তু এখন সেই টাকা ফেরত চাইতে গেলে নিজেকে অপরাধী মনে হয়। ফলে অনেক প্রয়োজন সত্ত্বেও টাকাটা চাওয়া হয় না।
৫. বছরের শুরুতে জীবন বদলে ফেলার বড় পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু বছর শেষে দেখলেন, পরিকল্পনার তেমন কিছুই বাস্তবায়ন হয়নি, শুধু ক্যালেন্ডারের সালটি বদলে গেছে।
৬. কোনো অনুষ্ঠান, অফিস কিংবা বন্ধুদের আড্ডায় যাওয়ার আগে প্রতিজ্ঞা করেছেন যে অপ্রয়োজনীয় একটি কথাও বলবেন না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে পারেননি।
৭. বাজারে গিয়ে দরদাম করে জিনিস কিনে নিজেকে খুব বুদ্ধিমান ভেবে বাড়ি ফিরেছেন। কিন্তু মা, বোন কিংবা স্ত্রী বিষয়টি জেনে হাসাহাসি করেছেন। হাসির কারণটি আপনি বুঝতে পারেননি, পরে জানতে পারলেন যে ওই জিনিসটি আরও কম দামে পাওয়া সম্ভব ছিল।
৮. রাতে ঘুমানোর আগে একটি টু–ডু লিস্ট লিখে ঘুমিয়েছেন এই লক্ষ্য নিয়ে যে জীবনটাকে গুছিয়ে নেবেন। কিন্তু সকালে সময়মতো উঠতে পারেননি। ফলে টু–ডু লিস্টের তারিখটি কেটে পরের দিনের তারিখ লিখে আবার এক ঘণ্টা ঘুমিয়ে পড়েছেন।
৯. ঠিক করেছিলেন যে এখন থেকে অস্বাস্থ্যকর খাবার আর মুখেই তুলবেন না। অথচ বিকেলে অফিসের নিচে নেমেই কয়েকটি শিঙাড়া আর জিলাপি খেয়ে ফেলেছেন।
১০. ভেবেছিলেন আজ রাত থেকেই আবার বই পড়া শুরু করবেন। পছন্দের বইটি কিনেও এনেছেন, কিন্তু সেই বই আর খোলাই হয়নি।
ফলাফল যাচাই করুন:
০–২: আপনি ব্যর্থ নন, আরও চেষ্টা করতে হবে।
৩–৫: ১০ জনের তালিকা করা হলে আপনার রোল হবে ৯ বা ১০। ফলাফলটা আন্দাজ করুন।
৬–৮: আপনি তালিকায় আছেন। চেষ্টা করুন, ভালো করবেন।
৯–১০: অভিনন্দন! আমার মতো আপনারও আজকের দিনটি পুরোপুরি কাজে লাগল!