গতকাল অত্যন্ত জাঁকজমকভাবে পালিত হয়েছে ‘আন্তর্জাতিক ব্যর্থতা দিবস’। তবে ক্যালেন্ডারের পাতায় কেবল একটি দিনকে ব্যর্থতার জন্য নির্দিষ্ট করে রাখা নিয়ে আমাদের মতো চিরব্যর্থদের মনে তীব্র ক্ষোভ রয়েছে। কারণ, আমাদের মতো লেজেন্ডদের জন্য তো বছরে ৩৬৫ দিনই এ দিবসের লাইফটাইম সাবস্ক্রিপশন চলছে!
এই বিশেষ দিনে আমার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছিল আমাদের টিমের কনিষ্ঠ রত্ন পিয়ালের মুখটি। পিয়ালের ব্যর্থতা সাধারণ কোনো ব্যর্থতা নয়; বরং এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক, শিল্পসম্মত এবং বিশ্বমানের রেকর্ড।
বাইরে থেকে পিয়ালকে দেখলে বিন্দুমাত্র বোঝার উপায় নেই যে তার বুকের ভেতর ব্যর্থতার পাহাড় জমে আছে। আসলে পাহাড় বললে ভুল হবে, বিষয়টি যেন ব্যর্থতার হিমালয় পর্বত! বন্ধুদের আড্ডায় তার হাবভাব এমন থাকে, যেন প্রেমতত্ত্বে তার দুটি পিএইচডি ডিগ্রি পকেটে আছে। কার মেসেজে কয়টি ‘হা হা’ রিঅ্যাক্ট দিলে প্রেম গাঢ় হয় কিংবা মুঠোফোনে কোন রিংটোন বাজলে মেয়েরা গলে জল হয়ে যায়—এসব বিষয়ে তার লেকচার শুনলে মনে হবে, সে যেন মজনু মিয়ার জ্যান্ত উত্তরসূরি। অথচ নিজের ক্ষেত্রে প্র্যাকটিক্যাল ফিল্ডে নামলেই পিয়ালের প্রেমতত্ত্বের সব সূত্র নিউটনের মাথায় পড়া আপেলের মতো আছড়ে পড়ে!
পিয়ালের প্রেমের ব্যর্থতার ইতিহাস যেন একটি ক্ল্যাসিক ট্র্যাজেডি গল্প। সে যার সাথেই প্রেম করতে গিয়েছে, কপালগুণে দেখা গিয়েছে যে সেই নারী হয় অন্য কারও অর্ধাঙ্গিনী, নয়তো চুপিসারে ‘দুই বাচ্চার মা’! বারবার হৃদয় ভাঙার ধাক্কায় পিয়াল যখন চিরতরে প্রেমসন্ন্যাস নিয়ে হিমালয়ে চলে যাওয়ার কথা ভাবছিল, ঠিক তখনই আমাদের দুই হাই-ভোল্টেজ মেন্টর ইকু ভাই আর কায়সার ভাইয়ের সান্নিধ্য পেল সে।
ইকু ভাই ও কায়সার ভাই সেই ঐতিহাসিক থিঙ্কট্যাংক মিটিংয়ে চায়ে চুমুক দিতে দিতে পিয়ালকে উৎসাহিত করে বললেন, ‘আরে বাদ দে, ভাই, ওই অতীত ব্যর্থতা! তোর মতো ডেডিকেটেড প্রেমিক পুরুষের কি থেমে থাকা সাজে? যা, লায়লাকে গিয়ে মনের কথা আজকেই বলে ফেল!’
সেই সময়ে লায়লার প্রতি পিয়ালের অনুভূতিগুলো ছিল অত্যন্ত রোমান্টিক ও করুণ। লায়লা যখন কলেজের করিডর দিয়ে হেঁটে যেত, পিয়ালের মনে হতো চারপাশের বাতাসে কোনো অদৃশ্য বেহালা বেজে উঠেছে। লায়লার ফেসবুক প্রোফাইলটি ছিল পিয়ালের কাছে পবিত্র কোনো তীর্থস্থানের মতো, যেখানে সে দিনে কয়েকবার হাজিরা দিতে যেত। লায়লার একটি মেসেজ বা রিঅ্যাক্ট পাওয়ার প্রতীক্ষায় পিয়াল রাতের পর রাত নির্ঘুম কাটিয়ে দিতে পারত।
অবশেষে ইকু ভাই ও কায়সার ভাইয়ের সেই জাদুকরি মোটিভেশনে ভর করে পিয়াল নতুন সাহসে বুক বেঁধে ফেলল। সে সোজা গিয়ে হাজির হলো লায়লার সামনে—বুক চিতিয়ে, একেবারে প্রেমের আবেদনপত্র নিয়ে। এরপর শুরু হলো এক মহাপ্রলয়ঙ্করী অপেক্ষা। মিনিট যায়, ঘণ্টা যায়, পিয়ালের বুকে আশার প্রদীপ দপদপ করে জ্বলতে থাকে; ঠিক যেমন আইপিএলের শেষ ওভারে শেষ বলের উত্তেজনা। কিন্তু ওপাশ থেকে ‘টুঁ’ শব্দটি পর্যন্ত শোনা গেল না! দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর যখন উত্তর খুঁজতে গেল পিয়াল, তখন দেখল প্রেমের কোনো রেশ তো দূরের কথা, লায়লার ফেসবুকের দরজাটাও তার জন্য বন্ধ! সে উপহার পেল এক আন্তর্জাতিকমানের ‘ব্লক’।
খবরটি শুনে ওর সাথে দেখা করে আমি বললাম, ‘আরে, কাল তো আসলে ব্যর্থতা দিবস ছিল, তাই আর যা–ই হোক এ দিনের সার্থকতা তুমি রেখেছ! প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হলেও ব্যর্থতার ইতিহাসে কিন্তু তোমার নাম একদম স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়ে গেছে।’
তবে পিয়ালকে সান্ত্বনা দিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে আমি ভাবছিলাম, ব্যর্থ প্রেমের ইতিহাসের দৌড়ে তো আমি সসম্মান এগিয়ে। তাই এই অলিখিত গোল্ডেন ট্রফির আসল দাবিদার তো আমি নিজেই! তাই আমার মতো সব ব্যর্থ মানুষকে জানাই আমার পক্ষ থেকে ব্যর্থতাপূর্ণ শুভেচ্ছা।