বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশন বললেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে এমন একজন মানুষের ছবি যিনি হয়তো কারো সঙ্গে কথা বলছেন না, সারা দিন ঘর অন্ধকার করে বসে আছেন, বাইরে বের হচ্ছেন না। কিংবা বিছানা থেকে ওঠার শক্তি পাচ্ছেন না, সামান্যতেই হাউমাউ করে কেঁদে ফেলছেন কিংবা বন্ধুদের এড়িয়ে চলছেন।
কিন্তু একজন হাসিখুশি প্রফুল্ল মানুষও যে বিষণ্ণতায় ভুগতে পারেন, তা অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য। প্রতিদিন হয়তো আপনার কোনো সহকর্মী বা বন্ধুকে দেখছেন যিনি বেশ স্বাভাবিকভাবে অফিস সামলাচ্ছেন, লাঞ্চের টেবিলে আড্ডায় মাতিয়ে রাখছেন, সোশ্যাল মিডিয়ায়ও বেশ সক্রিয়। আপনার মধ্যে কি কখনও এমন ভাবনা আসবে- তিনি ভেতরে ভেতরে চরম বিষণ্ণতায় ভুগছেন?
হয়তো আসবে না। অথচ মানসিক স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞদের মতে, একেই বলা হয় ‘স্মাইলিং ডিপ্রেশন’ বা ‘হাসির বিষণ্ণতা’। এটা যেমন আপনার পাশের মানুষের সঙ্গে হতে পারে, তেমনই হতে পারে আপনার নিজের সঙ্গেও।
‘স্মাইলিং ডিপ্রেশন’ আসলে কী?
চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ‘স্মাইলিং ডিপ্রেশন’ কোনো রোগের নাম নয়। তবে যুক্তরাজ্য ভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্য গবেষক ডক্টর অলিভিয়া রেমিস বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে- আপনার মুখ দেখে সবাই ভাবছে আপনি খুব সুখে আছেন, অথচ ভেতরে ভেতরে আপনি হতাশায় ডুবে যাচ্ছেন। আসলে আপনি অন্যের সামনে নিজের কষ্ট দেখাতে চাচ্ছেন না। মানুষের সামনে নিজের কষ্ট আড়াল করার এই প্রবণতাকেই বলা হয় ‘মাস্কিং’।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেব অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩২ কোটি মানুষ বিষণ্ণতায় আক্রান্ত। গত পাঁচ বছরে ইন্টারনেটে এই বিষয়টি নিয়ে মানুষের অনুসন্ধান প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে।
সাধারণত মানসিক অবসাদ বা বিষণ্ণতা বলতে আমরা বুঝি প্রতিদিনের সব কাজে আনন্দ হারিয়ে ফেলা। এটি সামাজিক সম্পর্ক ও ঘুমের ওপর প্রভাব ফেলে। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, বিষণ্ণতায় ভোগা প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষের উপসর্গগুলো প্রচলিত লক্ষণগুলোর চেয়ে কিছুটা ভিন্ন হয়।
কেন মানুষ কষ্ট লুকিয়ে মুখে হাসি রাখে?
ভেতরের কষ্ট গোপন রেখে বাইরে সব স্বাভাবিক দেখানোর পেছনে বেশ কিছু কারণ থাকে-
নিজের অজান্তেই আড়াল: অনেকে বুঝতেই পারেন না যে তারা ডিপ্রেশনে আছেন। মানসিক চাপকে তারা সারাদিনের ক্লান্তি আর ব্যস্ত জীবনযাত্রার স্বাভাবিক অংশ বলে ধরে নেন।
পারফেকশনিজম বা অতিরিক্ত দায়িত্ববোধ: বিশেষ করে যারা সব কাজে পারফেক্ট হতে চান, তারা অন্য কারো সামনে নিজের দুর্বলতা বা কষ্টের কথা স্বীকার করতে চান না। এ ধরনের মানুষ নিজেদের ওপর অনেক বেশি প্রত্যাশা রাখেন এবং এদের দায়িত্ববোধ বেশি থাকে। তাই, তারা যে কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে তা অন্যদের দেখাতে চায় না।
সামাজিক ভয় ও লোকলজ্জা: ‘লোকে কী বলবে?’- এই ভয়টাও কিন্তু বড় কারণ। মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার কথা জানালে কর্মক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ার ভয় থাকে। সম্পর্কের ওপর প্রভাব বা অন্যদের কাছে বোঝা হয়ে ওঠার আশঙ্কায়ও অনেকে মুখ বুজে থাকেন।
এ ছাড়া সাংস্কৃতিক বা পারিবারিক প্রত্যাশার কারণেও মন খুলে কথা বলা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
বিষণ্ণতার সাতটি লক্ষণ যা সহজে চোখে পড়ে না
আপনি মানসিকভাবে ঠিক আছেন নাকি ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ছেন, তা বুঝে নেওয়ারও কিছু সংকেত রয়েছে:
আনন্দ বা আগ্রহ হারিয়ে ফেলা: যে কাজগুলো করতে আগে ভালো লাগতো, কিন্তু এখন আর ভালো লাগছে না। যেমন- বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা, পছন্দের সিনেমা দেখা বা জিমে যাওয়া। প্রিয় কাজগুলো যদি এখন ঝামেলার বা একঘেয়ে মনে হতে থাকে, তাহলে সেটি বিষণ্ণতার লক্ষণ।
হাত-পা ভারী লাগা: চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে ‘লেডেন প্যারালাইসিস’ বলা হয়। মন খারাপের সঙ্গে হাত-পায়ে অস্বাভাবিক ভারী ভাব অনুভূত হতে পারে। স্বাভাবিক চলাফেরা করা কষ্টকর হয়ে যাওয়া এর একটি লক্ষণ।
বারবার পরিকল্পনা বাতিল করা: মানসিকভাবে ভালো না থাকলে এবং মানুষের সামনে আর হাসি বজায় রাখার শক্তি না থাকলে হুটহাট বন্ধুদের সঙ্গে বের হওয়ার প্ল্যান বাতিল করে দেওয়া।
ঠিকমতো ঘুমানোর পরও ক্লান্তি: রাতে ভালো ঘুম হয়েছে, তারপরও যেন ক্লান্তি কাটছেই না। একটু পরিশ্রমেই শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি চেপে বসে। বিশেষ করে সন্ধ্যা বা রাতের দিকে এটি আরও বেড়ে যায়। সারাদিনই ঘুমঘুম ভাব থেকে যায়।
অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা: বস বা সহকর্মীর সাধারণ কোনো মন্তব্য কিংবা বন্ধুর সামান্য একটু কটু কথায় স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি কষ্ট পাওয়া।
সবসময় আড্ডার কেন্দ্র হওয়া: আশ্চর্যের বিষয় হলেও সত্য, আড্ডায় সবচেয়ে হাসিখুশি থাকা মানুষটিই আসলে বিষণ্ণতায় ভুগতে পারেন। কিংবা সবাইকে সাহায্য করতে ব্যস্ত থাকা মানুষটিও নিজেকে ভেতরের কষ্ট থেকে দূরে রাখতে এমনটা করতে পারেন।
নেতিবাচক ভাবনা: বাইরে আত্মবিশ্বাসী দেখালেও নিজেকে নিয়ে সবসময় নেতিবাচক ভাবনা কাজ করে। নিজেকে মূল্যহীন মনে হয়, সবসময় একটা শূন্যতা ঘিরে থাকে। সহজ কথায় এ ধরনের মানুষেরা, নিজের প্রতি অনেক বেশি সমালোচনামূলক হতে পারেন।
এই স্মাইলিং ফেস আসলে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?
নিজের কষ্ট লুকিয়ে রেখে বাহ্যিকভাবে সবকিছু ‘ঠিক আছে’ এমন ভান করে থাকাটা কিন্তু বিপজ্জনক হতে পারে।
এতে করে মানুষ নিজেকে অন্যদের থেকে আড়াল করে নিজের ভেতর এক ধরনের একাকিত্ব তৈরি করে ফেলে। মানসিক বিশেষজ্ঞদের মতে, মন খারাপ কাটানোর সবচেয়ে বড় ওষুধ হলো মানুষের সঙ্গে মনখুলে কথা বলা, ভালোমন্দ সবকিছু শেয়ার করা। কিন্তু কষ্ট লুকিয়ে রাখলে সঠিক পরামর্শ পাওয়ার সুযোগ মেলেনা। এতে মানুষ অনেক ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
দীর্ঘ দিন ধরে প্রাথমিক এই লক্ষণগুলো অবহেলা করলে পরবর্তীতে তা মারাত্মক মানসিক সংকট, এমনকি আত্মহত্যার দিকেও ঠেলে দিতে পারে।
এর সমাধান আসলে কী?
সবসময় হাসির আড়ালে নিজের কষ্ট লুকিয়ে রাখবেন না। এক্ষেত্রে কিছু ছোট ছোট পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে:
মন খুলে কথা বলুন: কোনো বিশ্বস্ত বন্ধু, সঙ্গী বা পরিবারের মানুষের কাছে নিজের অনুভূতির কথা শেয়ার করুন। আপনি যখন আপনার খারাপ লাগাগুলো কাছের মানুষের সঙ্গে শেয়ার করবেন তখন নিজেকে অনেক হালকা লাগবে। আপনার সমস্যার কোনো সমাধানও হয়তো পেয়ে যেতে পারেন।
কাউন্সেলিং: নিজেকে এরকম পরিস্থিতি থেকে বের করতে না পারলে ডাক্তারের সঙ্গে বা কাউন্সেলরের সঙ্গে পরামর্শ করতে পারেন। এতে দ্বিধা করবেন না। কাউন্সেলিং, থেরাপি ও সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে এই সমস্যা থেকে সম্পূর্ণরূপে বের হয়ে আসা সম্ভব।
সবসময় ভালো থাকার ভান করার কোনো প্রয়োজন নেই। মানসিকভাবে ক্লান্ত বা বিষণ্ণ বোধ করাটা কোনো অপরাধ নয়, সাহস করে সাহায্য চাওয়াই আপনাকে সুস্থ জীবনে ফিরতে সাহায্য করবে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা