যখনই তাঁর পায়ে বল থাকে, গ্যালারিতে তখন এক অদ্ভুত প্রত্যাশা তৈরি হয়। দর্শকদের মনে হয়, এই বুঝি বিশেষ কিছু ঘটতে যাচ্ছে! হয়তো রক্ষণভাগ চিরে বেরিয়ে আসবে কোনো জাদুকরী পাস, অথবা ডিফেন্ডারদের বোকা বানিয়ে বল জড়াবেন জালে। এই ফুটবলারের নাম মাইকেল ওলিসে।
বায়ার্ন মিউনিখের মতো তারকাবহুল একটি দলে আলাদাভাবে নজর কাড়া মোটেও সহজ কাজ নয়। সেখানে বিশ্বমানের ফুটবলারদের কোনো অভাব নেই। তবে এই মৌসুম যত সামনে আগাচ্ছে, ফরাসি এই উইঙ্গার যেন বায়ার্নের সব আলো নিজের দিকে টেনে নিচ্ছেন। বয়স মাত্র ২৪ বছর, কিন্তু তাঁর খেলায় ফুটে উঠছে এক পরিণত আত্মবিশ্বাস।
গত মৌসুমে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের মাধ্যমে তিনি হয়েছিলেন বায়ার্নের বর্ষসেরা ফুটবলার। অনেকের ধারণা ছিল, সেই সাফল্যের পুনরাবৃত্তি করাই হবে তাঁর পরবর্তী চ্যালেঞ্জ। কিন্তু মাইকেল ওলিসে যেন অন্য কিছু পরিকল্পনা করেছেন। তিনি কেবল আগের অবস্থানেই দাঁড়িয়ে থাকতে চান না, বরং নিজেকে আরও উঁচুতে নিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর।
মৌসুমের শুরুতেই সেই ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। গত মাসে বরুসিয়া ডর্টমুন্ডের বিপক্ষে ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার সুপারকাপে তিনি আলো ছড়িয়েছেন। বায়ার্ন ২-১ গোলে জয়লাভ করে। ওই ম্যাচে মাইকেল ওলিসে নিজে একটি গোল করেন এবং আরেকটি গোল করিয়েছেন। ফলে ম্যাচসেরার পুরস্কারটিও তাঁর হাতেই ওঠে। নতুন মৌসুমে বায়ার্নের প্রথম ট্রফিটি অর্জনে ওলিসের স্বাক্ষর ছিল সবচেয়ে উজ্জ্বল।
এরপর বুন্দেসলিগায় স্টুটগার্টের বিপক্ষে বায়ার্নের ৫-১ গোলের জয়ে তিনি আবারও গোল করেন। আগস্ট মাসে মাত্র দুটি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ খেলেও তিনি দুটি গোল এবং একটি অ্যাসিস্ট করেছেন। সামগ্রিকভাবে বুন্দেসলিগায় এই মৌসুমে ৫টি ম্যাচে তিনি ৪টি গোল করেছেন এবং ২টি গোল করিয়েছেন। পরিসংখ্যানের দিক থেকে এই সংখ্যাগুলো খুব বিশাল মনে না হলেও, ফুটবলে সবকিছু কি আর কেবল সংখ্যা দিয়ে মাপা যায়?
একজন ফুটবলার কখন বল ছাড়ছেন, কখন গতি বাড়াচ্ছেন কিংবা কখন প্রতিপক্ষকে নিজের দিকে টেনে নিয়ে সতীর্থের জন্য জায়গা তৈরি করছেন—এই বিষয়গুলো গোল বা অ্যাসিস্টের খাতায় পুরোপুরি উঠে আসে না। মাইকেল ওলিসের বিশেষত্বই হলো এই জায়গাটি। তাঁকে আটকানো ডিফেন্ডারদের জন্য যেন এক জটিল ধাঁধা। যদি সামান্য জায়গা ছেড়ে দেওয়া হয়, তবেই বিপদ! সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি এমন পাস দিতে পারেন, যা মুহূর্তেই আক্রমণের রূপ বদলে দেয়। আবার খুব কাছে গিয়ে চাপ দিলেও রক্ষা নেই; পায়ের কারিকুরিতে প্রতিপক্ষকে পেছনে ফেলে বেরিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা তাঁর প্রবল। অর্থাৎ, দূরে থাকলেও বিপদ এবং কাছে গেলেও কোনো নিরাপত্তা নেই।
মাইকেল ওলিসের খেলায় গতি আছে, তবে তিনি কেবল গতির ওপর নির্ভর করেন না। তাঁর ড্রিবলিং দক্ষতা দর্শক মাতানোর জন্য নয়, বরং কার্যকর আক্রমণের অংশ। তাঁর খেলার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। কখন নিজে সামনে আগাবেন আর কখন সতীর্থকে দিয়ে আক্রমণ শেষ করাবেন, সেই বোধটি তাঁর মধ্যে ক্রমেই শাণিত হচ্ছে। আর এই পরিবর্তনই একজন প্রতিভাবান উইঙ্গার থেকে একজন প্রকৃত ম্যাচ-জয়ী ফুটবলারে পরিণত হওয়ার গল্প বলে।
বায়ার্ন ও বুন্দেসলিগা সমর্থকরাও এই বিষয়টি উপলব্ধি করছেন। তাঁদের ভোটের ফলাফলও সে কথা বলে। আগস্ট ও সেপ্টেম্বর—পরপর দুই মাসে বায়ার্ন ও বুন্দেসলিগার সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছেন ওলিসে।
বায়ার্নের মতো ক্লাবে এমন স্বীকৃতি পাওয়ার গুরুত্ব অনেক বেশি। এখানে প্রতি সপ্তাহেই কেউ না কেউ অসাধারণ কিছু করে দেখান। তারকাদের ভিড়ে সমর্থকদের মন জয় করতে হলে কেবল ভালো খেললেই চলে না, এমন কিছু করতে হয় যা দীর্ঘকাল মনে থাকে। মাইকেল ওলিসে ঠিক সেই কাজটিই করে যাচ্ছেন।
তবে বুন্দেসলিগায় আলো ছড়ানো আর চ্যাম্পিয়নস লিগে মহাতারকা হয়ে ওঠার মধ্যে একটি বড় পার্থক্য রয়েছে। ইউরোপের সর্বোচ্চ ক্লাব প্রতিযোগিতার নকআউট পর্বে একটি পাস, একটি ড্রিবলিং কিংবা কয়েক সেকেন্ডের একটি সিদ্ধান্ত পুরো ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারে। ৯০ মিনিটের লড়াইয়ে হয়তো সুযোগ আসে মাত্র একবার। সেই একবারে যিনি পার্থক্য গড়ে দিতে পারেন, ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাঁকেই মনে রাখে।
মাইকেল ওলিসে কি সেই ফুটবলার হয়ে উঠছেন?
ইউরোপীয় ফুটবলে এই প্রশ্নটি এখন ক্রমেই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। কারণ, তাঁর প্রতিভার সঙ্গে এখন ধারাবাহিকতা যুক্ত হয়েছে। আগে যে ঝলকগুলো বিচ্ছিন্নভাবে দেখা যেত, এখন সেগুলোই নিয়মিত ঘটছে। তিনি গোল করছেন, গোল করাচ্ছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে দায়িত্ব নিচ্ছেন। সবচেয়ে বড় কথা, নিজের সামর্থ্যের ওপর তাঁর বিশ্বাস দিন দিন বাড়ছে।
আক্রমণভাগের একজন ফুটবলারের জন্য ২৪ বছর বয়স অত্যন্ত সুন্দর একটি সময়। এই সময়ে তারুণ্যের বিস্ফোরণের পাশাপাশি অভিজ্ঞতাও কাজ করতে শুরু করে। কখন ছুটতে হবে আর কখন থামতে হবে, তা তিনি বুঝতে পারছেন। মাইকেল ওলিসে এখন সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।
চ্যাম্পিয়নস লিগে বায়ার্ন কত দূর যাবে, তা এখনই বলা কঠিন। আজ রাতে ক্লাবটির প্রতিপক্ষ নরওয়ের ক্লাব ভাইকিং। মাইকেল ওলিসে শেষ পর্যন্ত এই টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা তারকা হয়ে উঠবেন কি না, তা সময়ের হাতে।
তবে একটি বিষয় এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বায়ার্নে মাইকেল ওলিসে আর কেবল সম্ভাবনাময় কোনো তরুণ নন; তিনি এখন এমন একজন খেলোয়াড়, যাঁকে ঘিরে বড় স্বপ্ন দেখা যায়। মিউনিখে তারার অভাব কখনোই ছিল না, তবে সব তারার আলো এক রকম হয় না। কিছু তারা কেবল আকাশ আলোকিত করে, আর কিছু তারা ছড়িয়ে দেয় পথ দেখানোর আলো। মাইকেল ওলিসে এখন দ্বিতীয় দলে।