সরকারি হাসপাতালে তার পদবী অ্যানেস্থেসিওলজি বা অজ্ঞান বিশেষজ্ঞ বিভাগের জুনিয়র কনসালট্যান্ট। তবে বেসরকারি চেম্বার ও ক্লিনিকগুলোতে তিনি নিজেকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন ‘মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও সার্জন’ হিসেবে। অভিযোগ উঠেছে, তার নামে প্রকাশ্যে কিডনি, ব্রেস্ট টিউমার, পাইলস, অ্যাপেন্ডিক্স ও সিজারসহ অন্তত ২০ ধরনের জটিল অস্ত্রোপচারের প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

এই গুরুতর অভিযোগ উঠেছে বগুড়ার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের অ্যানেস্থেসিওলজি বিভাগের জুনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. মোস্তাকিম বিল্লাহ জনির বিরুদ্ধে। সম্প্রতি একটি অপারেশন থিয়েটারে তার দ্বারা পাইলসের অস্ত্রোপচার করার একটি ভিডিওচিত্র ফাঁস হওয়ার পর চিকিৎসা অঙ্গনে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।

তদন্ত করে জানা গেছে, বগুড়ায় সরকারি কর্মস্থল থাকা সত্ত্বেও সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের বেশ কিছু নামি বেসরকারি ক্লিনিকে ডা. মোস্তাকিম বিল্লাহ জনি নিয়মিত রোগী দেখান এবং জটিল অস্ত্রোপচার করেন। সম্প্রতি ধারণ করা ওই ভিডিওতে তাকে পাইলসের অস্ত্রোপচার করতে দেখা যায়। সেখানে উপস্থিত একজন বিশেষজ্ঞ সার্জন তার কাছে জানতে চান, অ্যানেস্থেসিওলজি বিভাগের চিকিৎসক হয়ে তিনি কীভাবে অস্ত্রোপচার করছেন। এই বিষয় নিয়ে দুই চিকিৎসকের মধ্যে একপর্যায়ে উত্তপ্ত বাকবিতণ্ডাও হয়।

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) পেশাগত আচরণবিধি অনুযায়ী, কেবল স্বীকৃত পোস্টগ্র্যাজুয়েট ডিগ্রি এবং বিএমডিসি নিবন্ধনের পরেই একজন চিকিৎসক বিশেষজ্ঞ পরিচয় ব্যবহার করতে পারেন বা বিশেষায়িত অস্ত্রোপচার করতে পারেন। চিকিৎসকদের মতে, বিশেষ করে জটিল অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে রোগীর নিরাপত্তার সাথে অনেক বিষয় জড়িত থাকে। এর মধ্যে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের দক্ষতা ও প্রশিক্ষণের পাশাপাশি অ্যানেস্থেসিয়া ব্যবস্থাপনা, অপারেশন থিয়েটারের পরিবেশ এবং প্রশিক্ষিত জনবলের উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. এ বি এম জাফর সাদিক জানান, অ্যানেস্থেসিওলজি ও সার্জারি একই সঙ্গে করার কোনো সুযোগ নেই। তিনি বলেন, “সম্প্রতি এ বিষয়ে নীতিমালা হয়েছে। একজন চিকিৎসক যে বিষয়ে ডিগ্রি করবেন, তাকে সংশ্লিষ্ট বিষয়েই কাজ করতে হবে। অ্যানেস্থেসিয়ার ডিগ্রি থাকলে একই সঙ্গে জেনারেল সার্জারির দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়।”

ডা. এ বি এম জাফর সাদিক আরও স্পষ্ট করে বলেন, “কেউ যদি অ্যানেস্থেসিওলজি ও জেনারেল সার্জারি—দুটি বিষয়েই ডিগ্রি করে থাকেন, তাহলেও একই সময়ে একই রোগীর ওপর দুই ধরনের দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। তাকে যেকোনো একটি বিষয়ে প্র্যাকটিস করতে হবে। তিনি হয় অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট, অথবা সার্জন। একই সঙ্গে দুই ধরনের দায়িত্ব পালন করা নীতিবিরোধী।”

তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন যে, অ্যানেস্থেসিয়ার সময় রক্তচাপ কমে যাওয়া বা স্যাচুরেশন কমে যাওয়ার মতো জটিলতা দেখা দিলে তা সামাল দিতে হয়। আবার একই ব্যক্তি যদি ওই রোগীর সার্জারিও করেন, তবে অস্ত্রোপচারের সময় রক্তপাত বা কোনো অঙ্গের ক্ষতির মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। একই সময়ে এই দুই ধরনের জটিলতা দেখা দিলে একজন চিকিৎসকের পক্ষে তা সামলানো সম্ভব নয়।

এদিকে ডা. মোস্তাকিম বিল্লাহর সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে দুপুর ২টা থেকে রোগী দেখার প্রচারণা চালানো হলেও তার সরকারি কর্মস্থল বগুড়ায়। ফলে সরকারি দায়িত্বের সময়ের সাথে তার বেসরকারি কার্যক্রমের কোনো সংঘাত হচ্ছে কি না, তা যাচাই করতে তার বায়োমেট্রিক হাজিরার তথ্য সংগ্রহ করা হয়। গত ১ আগস্ট থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৫২ দিনের হাজিরার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এর মধ্যে ৩৫ দিন তিনি হাসপাতালে উপস্থিতি দেখিয়েছেন। তবে প্রতিটি দিনের ইন-টাইম ও আউট-টাইম একই থাকায় সিস্টেমে উপস্থিতি থাকলেও তার কোনো প্রকৃত কর্মঘণ্টা দেখা যাচ্ছে না।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, ডা. মোস্তাকিম বিল্লাহ নিয়মিতভাবে জটিল অস্ত্রোপচার করছেন এমন তথ্য তাদের জানা নেই। বগুড়ার ২৫০ শয্যা মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মজিদুল ইসলাম বলেন, “উনি (মোস্তাকিম বিল্লাহ) অ্যানেস্থেসিয়া বিষয়ের কনসালট্যান্ট। উনি অপারেশন টিমের একজন সদস্য। কিন্তু উনি সার্জন হিসেবে কাজ করেন কি না, এ তথ্য আমার জানা নেই। আমার হাসপাতালে সাধারণত তিনি সার্জারি করেন না।”

বগুড়া বিএমএর সদস্যসচিব ডা. আব্দুল ওয়াহেদ বলেন, একজন অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট বা অবচেতনবিদ একই সঙ্গে একজন রোগীর অ্যানেস্থেসিয়া ও সার্জারি—দুটোই করতে পারেন না। যদি কেউ করে থাকেন, তবে সেটি আনইথিক্যাল প্র্যাকটিস এবং এর জন্য তাকে জবাবদিহির আওতায় আসতে হবে।

বগুড়া বিএমএর আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. আজফারুল হাবিব রোজ বলেন, যেকোনো চিকিৎসকই হোন, এমনকি কোনো এমবিবিএস চিকিৎসক হলেও তিনি কখনোই জবাবদিহির বাইরে নন। তবে আমাদের দুঃখের বিষয়, বগুড়া শহরে অনেক এমবিবিএস চিকিৎসক আছেন, যারা বিভিন্ন ধরনের অপারেশন করে থাকেন। তিনি আরও বলেন, একজন চিকিৎসকের স্কিল ও নলেজ থাকলে সীমিত কিছু সার্জারি করার ক্ষেত্রে আইনগতভাবে বাধা নেই, কারণ এমবিবিএস ডিগ্রির মধ্যে ব্যাচেলর অব সার্জারি ও ব্যাচেলর অব মেডিসিন রয়েছে। তবে তা অবশ্যই সীমিত কিছু সার্জারির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। একই সঙ্গে অ্যানেস্থেসিওলজি ও সার্জারির দায়িত্ব পালন করার কোনো সুযোগ নেই।

বগুড়ার ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. ফারজানুল ইসলাম নির্ঝর বলেন, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি বা প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ছাড়া বিশেষায়িত মেজর সার্জারি করা অনৈতিক। সরকারি দায়িত্বের সময় কর্মস্থলের বাইরে গিয়ে বেসরকারি কার্যক্রম পরিচালনারও সুযোগ নেই। তিনি বলেন, “সরকারি কর্মঘণ্টার পুরো সময় সরকারকে দিতে হবে। কর্মস্থলে থাকতে হবে এবং অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে হবে। এই সময়ের মধ্যে অন্য কোথাও যাওয়ার কথা নয়। সেখানে মেজর সার্জারি করা তো অনেক পরের কথা। উপযুক্ত কারণ ছাড়া কেউই তার কর্মস্থলই ত্যাগ করতে পারে না।”

এই সমস্ত অভিযোগের বিষয়ে ডা. মোস্তাকিম বিল্লাহ জনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “আমি এমবিবিএস ডাক্তার। আমি সব করতে পারি। কোনটা পারি না, সেটা আমাকে জানান। আমি অ্যানেস্থেসিয়ার ডাক্তার হয়ে সার্জারি করতে পারব না, এমন কথা কোথাও লেখা থাকলে আমাকে দেখান। আমি বলছি, আমি সব করতে পারি এবং আমাকে সেই অধিকার দেওয়া হয়েছে।”

তিনি আরও দাবি করেন, “সার্জারির বিষয়ে আমার ডিগ্রি এমবিবিএস। আমি পাইলস থেকে শুরু করে সব ধরনের অপারেশন করতে পারি। মেডিকেল সায়েন্সের আইন জানতে হলে সিভিল সার্জনের কাছ থেকে জানবেন।”