ব্যাংক খাতে আমানতের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলেও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের গতি ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। বেসরকারি খাতে ঋণ ও বিনিয়োগের এই ধীরগতির পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আদায়েও বড় ধরনের ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়েছে। অন্যদিকে, প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের নানাবিধ চ্যালেঞ্জের কারণে উন্নয়ন ব্যয়ের গতিও স্থবির হয়ে পড়েছে। মূল্যস্ফীতি কিছুটা হ্রাস পেলেও সাধারণ মানুষের আয় সেই অনুপাতে বাড়ছে না, বরং মজুরি বৃদ্ধির হার কমে আসায় প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা এখন চরম চাপের মুখে।
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) গত সেপ্টেম্বরের অর্থনৈতিক আপডেট ও আউটলুক পর্যালোচনায় দেশের অর্থনীতির এই উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠেছে। অর্থনীতির সামগ্রিক এই বিশ্লেষণে ঋণ, বিনিয়োগ, রাজস্ব, উন্নয়ন ব্যয়, কর্মসংস্থান এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে একটি স্পষ্ট যোগসূত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই প্রতিবেদনটিতে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতের চাপের বিষয়টি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
ব্যাংকে আমানত বাড়লেও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের গতি কমছে
জিইডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাংকে আমানত বাড়লেও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের গতি কমছে। প্রতিবেদনের তথ্যানুসারে, আগস্ট মাসে ব্যাংক খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ৯৬ শতাংশ। তবে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ।
এর অর্থ হলো, ব্যাংকে অর্থ জমার প্রবৃদ্ধি বাড়লেও তা বেসরকারি খাতে ঋণ সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হচ্ছে না। উচ্চ ঋণব্যয়, ব্যবসায়ীদের আস্থার অভাব এবং ঋণের ঝুঁকিকে এই পরিস্থিতির সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে জিইডি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, “সরকারের ঋণ গ্রহণ বেড়ে গেলে বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়ার সুযোগ সংকুচিত হতে পারে। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ দুর্বল থাকলে নতুন কারখানা স্থাপন, বিদ্যমান শিল্পের সম্প্রসারণ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম বাড়ানো কঠিন হতে পারে। এতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির গতিও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।” তবে ঋণ প্রবৃদ্ধির এই তথ্য দিয়ে এককভাবে পুরো ব্যবসা-বাণিজ্যে ধস নেমেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও মিশ্র সংকেত পাওয়া যাচ্ছে। জুলাই মাসে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি আগের মাসের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়ে ৩০৭ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এটি বিনিয়োগ কার্যক্রমে সম্ভাব্য পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দিলেও সামগ্রিক বেসরকারি বিনিয়োগে গতি ফেরার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। অন্যদিকে, আগস্টে তৈরি পোশাকসহ মোট রপ্তানি আয় আগের মাসের তুলনায় ৬ দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে। ফলে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের প্রকৃত পরিস্থিতি বুঝতে আরও তথ্যের প্রয়োজন রয়েছে।
রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা
জিইডির প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, বেসরকারি খাতে ঋণ ও বিনিয়োগের ধীরগতির পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আদায়েও ঘাটতি দেখা দিয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট সময়ে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮১ হাজার ৫৩ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ৫৫ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা। ফলে দুই মাসে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা।
শুধুমাত্র আগস্ট মাসে ৪২ হাজার ১৭২ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে ২৯ হাজার ৩০১ কোটি টাকা। ওই মাসে ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১২ হাজার ৮৭১ কোটি টাকা।
খাতভিত্তিক হিসাবে, আগস্টে ভ্যাট আদায়ে ঘাটতি হয়েছে ৬ হাজার ৭৬২ কোটি টাকা। আয়কর ও ভ্রমণ কর মিলিয়ে ঘাটতি ৩ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা এবং আমদানি-রপ্তানি শুল্কে ঘাটতি ২ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা।
যদিও আগের বছরের আগস্টের তুলনায় রাজস্ব আদায় ৭ দশমিক ৬০ শতাংশ বেড়েছে, তবু লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বড় ব্যবধান রয়ে গেছে। এই ঘাটতি সরকারের বাজেট বাস্তবায়ন ও ব্যয় ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। তবে রাজস্ব ঘাটতির পেছনে বেসরকারি ঋণ বা বিনিয়োগের ধীরগতিই একমাত্র কারণ, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য প্রতিবেদনে নেই।
গতি নেই উন্নয়ন ব্যয়েও
রাজস্ব আদায়ে ঘাটতির পাশাপাশি উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের গতিও অত্যন্ত কম। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ব্যয় হয়েছে ৫ হাজার ৭০৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে ব্যয় হয়েছিল ৫ হাজার ৭১৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় একই থাকলেও বাস্তবায়নের হার ২ দশমিক ৩৯ শতাংশ থেকে কমে ১ দশমিক ৮৫ শতাংশে নেমেছে।
বিদেশি ঋণ ও অনুদাননির্ভর প্রকল্পে ধীরগতি আরও স্পষ্ট। আগস্টে এসব প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ৮৫৭ কোটি ৪৪ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ৪৮ দশমিক ৪ শতাংশ কম। বিপরীতে সরকারি অর্থায়নের প্রকল্পে ব্যয় বেড়েছে ২৮ দশমিক ২ শতাংশ।
রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি সরকারের অর্থায়ন ব্যবস্থাপনায় চাপ বাড়ালেও এডিপি বাস্তবায়ন ধীরগতির পেছনে অর্থ ছাড়ের পাশাপাশি প্রকল্প প্রস্তুতি, দরপত্র, ক্রয়প্রক্রিয়া ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়নগত সমস্যাও ভূমিকা রাখতে পারে। জিইডি এসব ক্ষেত্রে সমন্বয় ও বাস্তবায়নের গতি বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছে।
বাড়ছে ব্যয়, কমছে আয়
অর্থনীতির এসব চাপের মধ্যে সাধারণ মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতার পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। আগস্টে দেশে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমেছে, যা জুলাইয়ে ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। কিন্তু একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ২২ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ হয়েছে। ফলে মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধির হার শূন্য দশমিক ২১ শতাংশীয় পয়েন্ট কম। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও মানুষের আয় সেই অনুপাতে বাড়ছে না। এতে সংসারের ব্যয় মেটাতে সীমিত আয়ের মানুষের ওপর চাপ অব্যাহত থাকতে পারে। বিশেষ করে খাদ্য ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে অসম প্রবণতা থাকায় মূল্যস্ফীতি কমার সুফল সবাই সমানভাবে পাচ্ছেন না।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশে বিনিয়োগ না বাড়ার অন্যতম কারণ অনুকূল পরিবেশের অভাব। বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত না হলে অর্থনীতিতে গতি ফেরানো কঠিন হবে। বিনিয়োগ বাড়াতে একসঙ্গে অনেক উদ্যোগ না নিয়ে ছয়-সাতটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ কার্যকর করে দেখাতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তি সহজ করা এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানো জরুরি।