ব্যাংক খাতে আমানতের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলেও তার বিপরীতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের গতি আশানুরূপ নয়। গত আগস্ট মাসে ব্যাংক আমানত বাড়লেও বেসরকারি খাতে ঋণ বৃদ্ধির হার ৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। অন্যদিকে, সরকারি খাতে ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ৩২ শতাংশের বেশি। অর্থনীতির এই সামগ্রিক পরিস্থিতির পাশাপাশি রাজস্ব সংগ্রহ এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে।
আজ সোমবার প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সেপ্টেম্বর মাসের ‘ইকোনমিক আপডেট অ্যান্ড আউটলুক’ প্রতিবেদনে এই চিত্র ফুটে উঠেছে।
জিইডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্টে ব্যাংক খাতের মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৩১ হাজার ১০০ কোটি টাকার বেশি। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এই আমানত ১১ দশমিক ৯৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। উল্লেখ্য, গত বছরের আগস্টে আমানত বৃদ্ধির হার ছিল ১০ দশমিক ০১ শতাংশ।
তবে আমানত বাড়লেও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধির হার হ্রাস পেয়েছে। আগস্টে বেসরকারি খাতে ঋণ বৃদ্ধির হার কমে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ। এর বিপরীতে সরকারি খাতে ঋণের পরিমাণ এক বছরে বেড়েছে ৩২ দশমিক ৪৫ শতাংশ। ফলে সরকারি ও বেসরকারি খাতে ঋণ বৃদ্ধির হারের মধ্যে এক বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি গত ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে।
রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রেও লক্ষ্যমাত্রার সাথে বড় ধরনের অমিল দেখা যাচ্ছে। আগস্ট মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪২ হাজার ১৭২ কোটি টাকা, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আদায় হয়েছে ২৯ হাজার ৩০১ কোটি টাকা। এর ফলে মাত্র এক মাসেই রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৮৭১ কোটি টাকা।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত ছিল ৮১ হাজার ৫৩ কোটি টাকা। এই সময়ে আদায় হয়েছে ৫৫ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা, যার ফলে জুলাই ও আগস্ট মিলিয়ে মোট ঘাটতি হয়েছে ২৫ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায়ের হার দাঁড়িয়েছে ৬৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ। তবে আশার কথা হলো, আগের বছরের আগস্টের তুলনায় চলতি বছরের আগস্টে রাজস্ব আদায় ৭ দশমিক ৬০ শতাংশ বেড়েছে। অর্থাৎ আদায়ের পরিমাণ বাড়লেও লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এনবিআর এখনো পিছিয়ে রয়েছে।
রাজস্ব আদায়ের পাশাপাশি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের গতিও অত্যন্ত ধীর। চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট সময়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপিতে ব্যয় হয়েছে ৫ হাজার ৭০৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই ব্যয় ছিল ৫ হাজার ৭১৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রথম দুই মাসে এডিপি ব্যয় সামান্য হ্রাস পেয়েছে। এই সময়ে এডিপি বাস্তবায়নের হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ১ দশমিক ৮৫ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২ দশমিক ৩৯ শতাংশ।
বৈদেশিক খাতের কিছু সূচকে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। আগস্টে দেশে প্রবাসী আয়ের পরিমাণ ছিল ২৯৬ কোটি ৭৫ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ২২ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। একই সময়ে মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ৩৭ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তবে আইএমএফের বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে গণনানুযায়ী রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩২ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার।
রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রে চিত্রটি ছিল বিপরীত। আগস্টে মোট রপ্তানি আয় আগের মাসের তুলনায় ৬ দশমিক ৩ শতাংশ কমে ৪৪২ কোটি ৯৪ লাখ ডলারে নেমেছে। এর মধ্যে তৈরি পোশাক রপ্তানি আয় কমেছে ৭ দশমিক ১ শতাংশ এবং অন্যান্য পণ্যের রপ্তানি আয় হ্রাস পেয়েছে ২ দশমিক ৪ শতাংশ।
মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ অব্যাহত রয়েছে। আগস্টে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ, যা জুলাই মাসে ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। এই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ২২ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ০৫ শতাংশে নেমেছে। ফলে আগস্টে মূল্যস্ফীতি মজুরি বৃদ্ধির চেয়ে শূন্য দশমিক ২১ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি ছিল। খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে ৭ দশমিক ০২ শতাংশ হলেও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৩২ শতাংশে।
সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে যে, ব্যাংক আমানত ও প্রবাসী আয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের উন্নতি হলেও বেসরকারি ঋণপ্রবাহ, রাজস্ব আদায় এবং উন্নয়ন ব্যয়ের সূচকগুলো এখনো দুর্বল রয়ে গেছে।