সরকারের ব্যাংকঋণ ক্রমাগত বাড়ছে, অথচ ব্যবসার ঋণ বাড়ছে না। অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের এই চিত্র বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য এক গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অর্থবছরের প্রথম তিন মাস বা একটি প্রান্তিক শেষ হওয়ার পর সরকারের আয়-ব্যয়, ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ এবং বেসরকারি খাতের ঋণের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে অর্থনীতির আগামীর পথরেখা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এই হিসাবগুলো কেবল অর্থনীতিবিদ বা নীতিনির্ধারকদের জন্য সীমাবদ্ধ নয়; কারণ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, ব্যবসায়িক ঋণ, সরকারি ব্যয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিস্থিতির সঙ্গে সাধারণ মানুষের আয় ও জীবনযাত্রার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

অন্যদিকে, বাজেট বাস্তবায়নের ত্রৈমাসিক পর্যালোচনার একটি আইনি বাধ্যবাধকতা বিদ্যমান। ২০০৯ সালের সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা আইনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, অর্থমন্ত্রী বাজেটের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রাজস্ব সংগ্রহ ও ব্যয়ের গতিধারা ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে পর্যালোচনা করবেন। এই পর্যালোচনার ফলাফল এবং প্রয়োজনীয় করণীয়সংক্রান্ত প্রতিবেদন সংসদের পরবর্তী অধিবেশনে উপস্থাপন করতে হবে। তবে পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে দেখা গেছে, প্রথম তিন মাসের মূল্যায়ন অনেক ক্ষেত্রে ছয় মাস পর সংসদে এসেছে এবং শেষ দিকে নিয়মিত প্রতিবেদন উপস্থাপনের প্রক্রিয়াটি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আশা করা হচ্ছে, এবার তেমনটি হবে না।

সরকারি পর্যালোচনার জন্য অপেক্ষা না করেও অর্থনীতির বর্তমান গতিপথ কিছুটা বোঝা সম্ভব। বর্তমানে অর্থনীতির অনেক তথ্য-উপাত্ত সহজেই পাওয়া যায়। বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের ওয়েবসাইটে প্রতি সপ্তাহে অর্থনীতির ১৯টি সূচক মাত্র দুই পৃষ্ঠায় প্রকাশ করে। চলতি বছরের ২৮ জুন ও ২৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদন দুটি পাশাপাশি বিশ্লেষণ করলে এক প্রান্তিকে অর্থনীতির কোন সূচকের উন্নতি হয়েছে, কোনটির অবনতি হয়েছে এবং কোথায় নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তার একটি প্রাথমিক চিত্র পাওয়া যায়।

সবগুলো সূচক বিস্তারিত বিশ্লেষণ করার সুযোগ নেই, কারণ সব উপাত্ত তিন মাস পর্যন্ত হালনাগাদ করা হয়নি। তবে সামগ্রিকভাবে বলা যায়, খুব ভালো অবস্থায় আছে এমন কোনো সূচক নেই; বরং বলা যায়, পতন ঠেকানো গেছে; কিন্তু উত্তরণের ছাপ নেই।

এই সূচকগুলো বিশ্লেষণ করলে পাঁচটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে। যেমন— মূল্যস্ফীতির চাপ কি সত্যিই কমেছে? সরকারি ঋণ কতটা বেড়েছে? বেসরকারি খাতের ঋণ কেন এত কম? টাকার সরবরাহ কি বেশি বাড়ছে? এবং বৈদেশিক মুদ্রা ও রিজার্ভের অবস্থার উন্নতি কতটা টেকসই?

এর মধ্যে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারি ও বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধির বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনার দাবি রাখে। দেখা যাচ্ছে, গত ২৮ জুন দেশে সরকারি ঋণের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ছিল ৩০ দশমিক ৩৭ শতাংশ, যা তিন মাস পরে বেড়ে হয়েছে ৩৪ দশমিক ১১ শতাংশ। অন্যদিকে, একই সময়ে বেসরকারি খাতের ঋণ ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে আরও কমে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৬২ শতাংশে।

এই দুটি উপাত্ত অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ, বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি গত ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর ফলে অর্থনীতির একটি অস্বস্তিকর ছবি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে— ব্যাংকব্যবস্থায় ঋণের প্রবৃদ্ধি ক্রমেই সরকারমুখী হচ্ছে, আর বেসরকারি খাতের ঋণ স্থবির হয়ে আছে।

জানা যায়, সরকারের আয় অনেক কম, অথচ ব্যয় বেড়েই চলছে। এর ফলে সরকারকে ব্যাংকের ওপর অধিক নির্ভরশীল হতে হচ্ছে। তবে এমন নয় যে সরকার বেশি ঋণ নিচ্ছে বলে বেসরকারি খাত ঋণ পাচ্ছে না। মূলত বিনিয়োগের অনিশ্চয়তার কারণে বেসরকারি খাত ঋণ নিতে আগ্রহী নয়। উচ্চ সুদের হারের কারণে ঋণ সস্তা নয়, ফলে প্রয়োজন ছাড়া কেউ ব্যাংকের দ্বারে যাচ্ছেন না। এই মুহূর্তে জ্বালানিসংকট অন্যতম প্রধান বাধা হিসেবে কাজ করছে। কেউ কেউ উচ্চ সুদ হারের কথা বললেও, বাংলাদেশের ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে উচ্চ সুদহারকেই বিনিয়োগ না হওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ইনস্টিটিউট অব পাবলিক ফাইন্যান্স নামের একটি সংস্থা রয়েছে। এই সংস্থার জার্নালে ২০২৫ সালে একটি গবেষণা প্রকাশ করেছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের দুই যুগ্ম সচিব আবদুল মান্নান ও আসিফ ইকবাল। তাঁদের গবেষণার মূল কথা হলো, অর্থনীতি ভালো করলে এবং প্রবৃদ্ধি হলে তার প্রভাবে পরবর্তী সময়ে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ে। ব্যবসায়ীরা যদি বাজার ও অর্থনীতি বড় হওয়ার সম্ভাবনা না দেখেন, তবে শুধু সুদ কমানো বা প্রণোদনা দিয়ে বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো কঠিন।

সমস্যাটি এখানেই। আমাদের গড় প্রবৃদ্ধি কমে প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে। মূল্যস্ফীতির তুলনায় মজুরি বাড়ছে খুব কম হারে, ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে এবং সামগ্রিক চাহিদা কমেছে। জ্বালানিসংকটের সমাধান কবে হবে, তা অনিশ্চিত। এই পরিস্থিতিতে বিনিয়োগ করতে কেউ আগ্রহী হবেন না।

গত চার বছর ধরে অর্থনীতির সবচেয়ে খারাপ সূচক হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি। এটিকে একপাশে রাখলে, বর্তমানে সবচেয়ে উদ্বেগজনক সূচক সম্ভবত বেসরকারি খাতের ঋণের নিম্ন প্রবৃদ্ধি এবং সরকারের অব্যাহত ব্যাংকঋণ। কারণ, ব্যাংকের ঋণ উৎপাদনশীল বেসরকারি খাতের পরিবর্তে ক্রমেই সরকারি অর্থায়নের দিকে মোড় নিচ্ছে। এতে সাময়িকভাবে সরকার ব্যয় চালাতে পারলেও টেকসই প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না। এর দ্রুত সমাধান না হলে আজকের এই দুর্বল ঋণ প্রবৃদ্ধিই আগামী দিনের কম বিনিয়োগ, কম কর্মসংস্থান এবং নিম্ন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে রূপ নেবে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে এই পরিস্থিতি হবে অত্যন্ত বিপজ্জনক একটি চিত্র।