সকালের সেশনের তৃতীয় ওভার। কায়েস আহমেদের বলে স্লিপে ক্যাচ দিয়ে বেঁচে যান লিটন। তবে ফিল্ডারের হাতে ক্যাচটি জমেনি। সেই মুহূর্তেই কি লিটনের কপালে সেঞ্চুরির কথা লেখা হয়ে গিয়েছিল?
তখন লিটনের সংগ্রহ ছিল ১৪ রান, যা মূলত ‘৭’-এর দ্বিগুণ। বিশ্বের প্রায় সব সংস্কৃতির মানুষের বিশ্বাস, ৭ সংখ্যাটি সৌভাগ্যের প্রতীক। লিটন সেখানে ‘ডাবল লাকি সেভেনে’ থেকে বেঁচে যান। তুক–তাকে বিশ্বাসী তাঁর ভক্তরা কি তখনই আঁচ করতে পেরেছিলেন যে ৭ম সেঞ্চুরিটি আসছে?
আবুধাবি টেস্টের গতিপ্রকৃতি অনুযায়ী বাংলাদেশ তখন লিড যতটা সম্ভব বাড়িয়ে নেওয়ার পথে। লিটন সেখানে সকালেই ‘জীবন’ পাওয়ায় তাঁর কাছে সেঞ্চুরিটা বহুদিক বিচারেই পাওনা ছিল। ফিফটিতে থামতে হয়েছে আগের ইনিংসে। আর সেই ফিফটির আগে অস্ট্রেলিয়া সফরে ০, ০ এবং ০।
ক্রিকেটীয় বিষয় বাদ দিন। ৭—সংখ্যাটি যেহেতু সৌভাগ্যের প্রতীক, সংখ্যাতত্ত্বের ইঙ্গিত তো কিছুটা ছিলই। অবশ্য সেটা মনে মনে বানিয়ে নেওয়া। টেস্টে তাঁর ৬ নম্বর সেঞ্চুরির ইনিংস থেকে হিসাব করলে ৭ নম্বর সেঞ্চুরিটা (১০২) পেলেন আজ সপ্তম ইনিংসে।
ব্যাপারগুলোতে হয়তো বাস্তবতার যুক্তি নেই। কিন্তু বিশ্বাস আছে। যেমনটা ব্যাটসম্যানকেও নিজের ওপর বিশ্বাস রেখে নামতে হয়। গ্যালারির দর্শকও সেই আস্থাটা রাখেন তাঁর ওপর। আর সেই আস্থা রেখে ৭ সংখ্যাটি কেন সৌভাগ্যের প্রতীক ভাবতে ভাবতে এবং মাঠে তাঁর একের পর এক ‘জীবন’ পাওয়া দেখে একটা বিশ্বাস সত্যিই ভর করেছিল। কোথায় যেন একটা যোগ আছে। আজ পাবেনই পাবেন! নইলে আরও দুবার বেঁচে যান কীভাবে!
লিটন তখন ২৬ রানে। কায়েসের অফ স্টাম্পের বাইরের হাফ ভলি বল টেনে মেরে ফিরতি ক্যাচ দেন। বলে প্রচণ্ড গতি থাকায় ক্যাচটা হাতে রাখতে পারেননি এই লেগ স্পিনার। ধারাভাষ্যকারের কণ্ঠে ততক্ষণে ‘লাকি লিটন’! অবশ্য ব্যাটসম্যানের কোনো বিকার নেই। যেন জানতেন আজ দিনটা তাঁরই।
সেটা আরও পরিষ্কার হলো আফগানিস্তান নতুন বল নেওয়ার পর। লিটন তখন ৬৭। আফগান পেসার ইয়ামিনের বলে ‘বিট’ হলেন। আউটের আবেদন হলেও আম্পায়ার সাড়া দেননি। ওদিকে রিভিউও ফুরিয়ে ফেলেছে আফগানিস্তান। ভিডিও রিপ্লেতে দেখা গেল বল লিটনের ব্যাটের ভেতরের কানা ছুঁয়ে জমা পড়েছে উইকেটকিপারের গ্লাভসে। ইয়ামিনের মুখে রাজ্যের হতাশা, লিটনের মুখে মিটি মিটি হাসি। ধারাভাষ্যকারের মুখে আবারও সেই কথা ‘লাকি লিটন’! ততক্ষণে সেটা প্রতিষ্ঠিত সত্য।
তিনবার ‘জীবন’ পেয়ে কেউ ধীরে ধীরে ৭ম সেঞ্চুরির দিকে এগোলে জানতে ইচ্ছে করে, পৃথিবীর সবাই কেন ‘৭’ কে সৌভাগ্যের প্রতীক মনে করে?
যেমন ধরুন, গবেষকেরা লক্ষ করেছেন, ১-১০–এর মধ্যে সবচেয়ে সহজে যে সংখ্যাটি মনে রাখা যায়, সেটি হলো ৭। গণিতজ্ঞদের বিশ্বাস যে ৭ সংখ্যার মধ্যে এমন কোনো প্রাকৃতিক ব্যাপার রয়েছে, যে কারণে এটি নিজে নিজেকে শুভ ইচ্ছা–আকাঙ্ক্ষার জন্য আকর্ষণীয় করে তুলেছে। আর তাই ৭ এমন একটি সংখ্যা, যেটিকে মানুষ প্রাকৃতিকভাবেই মনে রাখে বা রাখতে পারে। শুধু তা–ই নয়, প্রকৃতিতে ৭ সংখ্যার একটি গুরুত্ব রয়েছে। যেমন ৭ দিনে এক সপ্তাহ, রংধনুতে ৭টি রং, ৭টি মহাদেশ। প্রাচীন ও মধ্যযুগে রয়েছে ৭টি করে বিস্ময়। আর ১-১০–এর মধ্যে এটি সবচেয়ে বড় ‘প্রাইম’ নাম্বার।
সে যা–ই হোক, উইকেটকিপার হিসেবে এটা টেস্টে লিটনের ষষ্ঠ সেঞ্চুরি। এই পথে লিটন ছুঁয়ে ফেললেন ভারতের কিংবদন্তি মহেন্দ্র সিং ধোনিকে। উইকেটকিপার হিসেবে ধোনির সেঞ্চুরিও ৬টি। তুক–তাকে বিশ্বাসীরা অবশ্য ভাবতে পারেন, ধোনিকে ছুঁতে তাঁর জার্সি নম্বর হয়তো লিটনকে টেনেছে। ধোনির জার্সি নম্বর যে ৭!
কিন্তু ক্রিকেটে আসলে এসব বিশ্বাসের জায়গা নেই। মাঠে পারফরম্যান্স লেখা হয় ঘামে ভিজে। সেই যে গত মে মাসে পাকিস্তানের বিপক্ষে এক সেঞ্চুরি ও ফিফটি পেলেন তারপর তো টানা তিনবার শূন্য রানে আউট হয়ে রানের ক্ষেত্রে ভীষণ ঋণী হয়ে গিয়েছিলেন লিটন। এই টেস্টে লিটন শুধু তা সুদে–আসলে পুষিয়েই দেননি, বরং একটি ‘বোনাস’ও মিলেছে।
সেঞ্চুরির পথে ইয়ামিনকে চোখজুড়ানো স্ট্রেট ড্রাইভে দুটো চার মারেন লিটন। প্রশ্ন উঠতে পারে, এই টেস্টে লিটনের ওই দুটি শট বেশি সুন্দর না কিপিং?
গতকাল হাসান মাহমুদের হ্যাটট্রিকে ডান দিকে ঝাঁপিয়ে নেওয়া ক্যাচটি কিংবা আফগানিস্তানের প্রথম ইনিংসে হাশমতউল্লাহ শহীদিকে করা স্টাম্পিং। আবুধাবি টেস্টে এখন পর্যন্ত তাঁর ক্যাচ ছয়টি। অর্থাৎ এখানেও সেই ‘৭’–এর খেল!
টেস্টে এক ম্যাচে বাংলাদেশের উইকেটকিপারদের মধ্যে সর্বোচ্চ ডিসমিসালের রেকর্ড এত দিন ছিল খালেদ মাহমুদের দখলে। ২০০৪ সালে জিম্বুয়ের বিপক্ষে হারারে টেস্টে। লিটন আজ তাঁর পাশে বসলেন। ওহ, ডিসমিসাল সংখ্যাটা বলাই হয়নি। সেটা একটি ধাঁধায় দেওয়া যাক।
লুডোর ছক্কার ঘুঁটিতে দুই বিপরীত পাশের অঙ্কগুলো যোগ করলে সব সময় যে সংখ্যাটা হয়, সেটা। যেমন যে পিঠে ৫ তার অপর পিঠে থাকে ২, যে পিঠে ৬, তার অপর পিঠে ১, যে পিঠে ৩, তার অপর পিঠে ৪..।