নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে রাঙামাটির জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র সাজেক ভ্যালিতে সাময়িকভাবে পর্যটকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে জেলা প্রশাসন। প্রশাসনের এই আকস্মিক ঘোষণার পর সাজেককেন্দ্রিক পর্যটন ব্যবসায় বড় ধরনের ধস নেমেছে। এর ফলে হোটেল-রিসোর্ট, কটেজ, রেস্তোরাঁ এবং পরিবহন খাতের সঙ্গে যুক্ত শত শত ব্যবসায়ী ও শ্রমিক চরম অনিশ্চয়তা এবং ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন।

রাঙামাটি জেলা প্রশাসকের স্বাক্ষরিত একটি জরুরি গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সাজেক পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে সেখানে অবস্থানরত পর্যটকদের আগামী ১৩ অক্টোবর বিকেল ৫টার মধ্যে নিরাপদে এলাকা ছেড়ে নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এর আগে স্থানীয় কিছু সংগঠনের ডাকা সড়ক অবরোধের কারণে সাজেকগামী সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, যার ফলে বহু পর্যটক চরম বিপাকে পড়েন। সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনা করে প্রশাসন এই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও এর নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি পড়েছে স্থানীয় অর্থনীতিতে।

স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ীদের মতে, সাজেক কেন্দ্র করেই এই অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা নির্বাহ হয়। হঠাৎ করে এই নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়ায় হোটেল-রিসোর্ট মালিকদের পাশাপাশি পরিবহন মালিক, জিপচালক, রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী, স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং হস্তশিল্প বিক্রেতারাও মারাত্মক সংকটে পড়েছেন।

সাজেক গাড়ির লাইনম্যান মো. ইয়াছিন আরাফাত বলেন, “সাধারণত শুক্র ও শনিবার বাদে অন্যান্য দিনে প্রতিদিন ৬০ থেকে ৭০টি গাড়ি সাজেকে প্রবেশ করে। শনিবার রাতেও ৫৮টি গাড়িতে প্রায় ৫০০ পর্যটক এসেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাজেক বন্ধ ঘোষণায় গাড়িচালক ও ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ব্যবসার এমন সময়ে কেউ এ পরিস্থিতি চান না।”

অবকাশ রিসোর্টের ম্যানেজার মো. নাজিম উদ্দিন জানান, আগামী ১৬ থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত সাজেকের অধিকাংশ রিসোর্ট ও কটেজের বুকিং আগেই সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে পূজার ছুটিকে কেন্দ্র করে ১৯ তারিখ থেকে শতভাগ বুকিং ছিল। কিন্তু হঠাৎ বন্ধের সিদ্ধান্তে এখন অগ্রিম বুকিং বাতিল করে টাকা ফেরত দিতে হচ্ছে। মৌসুমের শুরুতেই এই ক্ষতির ধাক্কা সামলে ওঠা অনেক ব্যবসায়ীর পক্ষেই সম্ভব হবে না বলে তিনি মনে করেন।

রিসোর্ট মালিকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাজেকে ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ১৩৫টি রিসোর্ট এবং শতাধিক রেস্তোরাঁ রয়েছে। এছাড়া প্রতিদিন গড়ে ২০০টি পর্যটকবাহী গাড়ি সাজেকে আসা-যাওয়া করে। প্রতিটি গাড়ির গড় ভাড়া প্রায় ১৩ হাজার টাকা। শুধুমাত্র যানবাহন খাত থেকেই ১০ দিনে অন্তত ২ কোটি ২৬ লাখ টাকার ব্যবসা হতো। অন্যদিকে, সাজেকের ১৩৫টি রিসোর্টে প্রায় ৬৭৫টি কক্ষ রয়েছে। এসব কক্ষের ভাড়া বাবদ প্রতিদিন ন্যূনতম ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা আয় হয়। ফলে আগামী ১০ দিনে শুধু কক্ষভাড়া বাবদই প্রায় ২ কোটি ২৫ লাখ টাকার ক্ষতি হবে। রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য দোকানের ক্ষতি হিসাব করলে এই ক্ষতির পরিমাণ আরও অনেক বাড়বে।

সাজেক রিসোর্ট মালিক সমিতির সভাপতি সুপর্ন দেব বর্মন বলেন, “জেলা প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী মঙ্গলবার বিকেলের মধ্যে সব পর্যটক সাজেক ত্যাগ করবেন। কিন্তু অনির্দিষ্টকালের এ নিষেধাজ্ঞার কারণে সাজেকের পুরো ব্যবসা-বাণিজ্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। সাজেকের ১৩৫টি রিসোর্টে ১৬ থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত শতভাগ বুকিং ছিল। পরিস্থিতি বিবেচনা করে দ্রুত এ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি।”