সিলেটের গোয়াইনঘাটে বর্বরোচিত এক হামলায় হারিছ আলী (৫৫) নামের এক ব্যক্তির কবজি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। অভিযোগ উঠেছে, তাকে দা দিয়ে কুপিয়ে এবং লাঠি দিয়ে নির্মমভাবে পেটানো হয়েছে। বর্তমানে তিনি সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
গতকাল রোববার রাত সাড়ে আটটার দিকে গোয়াইনঘাট উপজেলার তোয়াকুল বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে কামারগ্রাম এলাকার একটি বাঁশঝাড়ের পাশে এই ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী হারিছ আলী উপজেলার ফুলতৈছগ্রামের বাসিন্দা এবং পেশায় একজন কৃষক।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হারিছ আলী মুক্তকণ্ঠকে জানান, রোববার রাতে তোয়াকুল বাজারে একটি সালিসের কার্যক্রমে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। সালিস শেষ করে রাত সাড়ে আটটার দিকে তিনি পায়ে হেঁটে বাড়ির দিকে রওনা হন। তাঁর পেছনে একই এলাকার আরও একজন পথচারী ছিলেন। বাজার থেকে তাঁর বাড়ির দূরত্ব প্রায় দুই কিলোমিটার। পথে কামারগ্রাম এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা হঠাৎ তাঁর সামনে এসে থামে।
হারিছ আলীর ভাষ্য, অটোরিকশা থেকে পাঁচজন লোক দা ও লাঠি নিয়ে নামেন। তাঁরা তাঁকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘গুন্ডারে বহুত দিনে পাইছি।’ এরপরই একজন আক্রমণকারী দা দিয়ে তাঁকে কোপ দেন। সেই প্রাণঘাতী কোপ থেকে বাঁচতে তিনি যখন ডান হাত দিয়ে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করেন, তখনই তাঁর কবজির ওপরের অংশ কেটে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপরই হামলাকারীরা তাঁকে এলোপাতাড়ি লাঠি দিয়ে পেটাতে শুরু করেন। এই নৃশংসতার সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর পেছনে থাকা পথচারী ভয়ে দ্রুত পালিয়ে যান।
ভুক্তভোগীর বিবরণ অনুযায়ী, তাঁর চিৎকার এবং হামলাকারীদের কথাবার্তা শুনে আশপাশের লোকজন দ্রুত এগিয়ে এলে হামলাকারীরা অটোরিকশায় করে দ্রুতবেগে পালিয়ে যান। পরবর্তীতে স্থানীয় বাসিন্দারা রাস্তার পাশের একটি খাদ থেকে তাঁকে উদ্ধার করে দ্রুত ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান।
হারিছ আলীর দাবি, তিনি হামলাকারীদের চিনতে পেরেছেন। তাঁর মতে, আক্রমণকারীরা হলেন একই গ্রামের এমরান, মোহাম্মদ, বুরহান, নজরুল এবং অটোরিকশাচালক ইমাম। এদের মধ্যে এমরান, মোহাম্মদ ও বুরহান পরস্পর ভাই। তিনি আরও জানান, এমরানই তাঁকে দা দিয়ে কুপিয়েছেন।
প্রথম কোপেই তাঁর হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় বলে জানান হারিছ আলী। তিনি বলেন, এরপর তিনি কাটা হাতটি খুঁজেছিলেন। তবে হাতের দিকে তিনি তাকানটি। হাত থেকে অঝোরে রক্ত ঝরছিল। পরে উদ্ধারকারীদের একজন নিজের পাঞ্জাবি দিয়ে হাতে বেঁধে দিয়েছিলেন। তাঁকে উদ্ধার করা স্থানীয় লোকজনকেও হাতটি খুঁজে হাসপাতালে নিয়ে আসার অনুরোধ করেছিলেন তিনি। তবে কাটা হাতটি আর পাওয়া যায়নি।
হারিছ আলী আরও জানান, হামলাকারীদের মধ্যে নজরুলের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। গত চৈত্র মাসে (মার্চের দিকে) তাঁর একটি গরু চুরি হয়। পরে দীর্ঘ অনুসন্ধান এবং ৫০ হাজার টাকা খরচ করে তিনি গরুটি উদ্ধার করেন। যে স্থান থেকে গরুটি উদ্ধার করা হয়েছিল, সেখান থেকেই তিনি জানতে পারেন যে নজরুল গরুটি চুরি করে অন্যত্র লুকিয়ে রেখেছিলেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁদের মধ্যে চরম বিরোধ তৈরি হয়। যদিও পরবর্তীতে বিষয়টি সালিসের মাধ্যমে মীমাংসা করা হয়েছিল, তবে নজরুল সেই বিরোধ জিইয়ে রেখেছিলেন বলে দাবি করেন হারিছ আলী।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন হারিছ আলীকে দেখতে আসেন তাঁর ভাগনে আবদুর রশিদ। তিনি জানান, তাঁর মামা কৃষিকাজ করে সংসার চালান এবং তাঁর দুই ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। ডান হাত হারানোয় তিনি সম্পূর্ণ কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন। এখন কীভাবে সংসার চলবে, তা নিয়ে পরিবারের সদস্যরা চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছেন।
ঘটনার পর অভিযুক্ত মোহাম্মদের মোবাইলে কল করা হলে প্রথমবার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি এবং পরবর্তীতে তাঁর মোবাইলটি বন্ধ পাওয়া যায়। এছাড়া অভিযুক্ত নজরুল থেকেও কোনো বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
এই বিষয়ে গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওমর ফারুক মোড়ল জানান, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো মামলা দায়ের করা হয়নি। তবে পুলিশ ঘটনাটি জানার পর তদন্ত শুরু করেছে এবং হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হচ্ছে।