শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলায় এক অভিনব উদ্যোগের মাধ্যমে তৈরি করা হচ্ছে ২০ ফুট উচ্চতার এক বিশাল দুর্গাপ্রতিমা, যার বিশেষত্ব হলো এটি তৈরি হচ্ছে মটর ডাল দিয়ে। এই ব্যতিক্রমী প্রতিমাটি নির্মাণে ব্যবহার করা হচ্ছে অন্তত এক মণ মটর ডাল। পুরো প্রতিমা নির্মাণ এবং এর সাজসজ্জার পেছনে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩০ লাখ টাকা। দীর্ঘ তিন মাসের কঠোর পরিশ্রমে ছয়জন দক্ষ শিল্পীর নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় গড়ে উঠছে এই দৃষ্টিনন্দন প্রতিমাটি।

নড়িয়া উপজেলার ভোজেশ্বর ইউনিয়নের ঘোষপাড়া শ্রী শ্রী রাধাগোবিন্দ ধাম দুর্গামন্দিরে এই বিশেষ প্রতিমাটি নির্মাণ করা হচ্ছে। মটর ডালের এই অনন্য শিল্পকর্মটি দেখার জন্য ইতিমধ্যেই ভক্ত ও সাধারণ দর্শনার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ও কৌতূহল তৈরি হয়েছে।

সরেজমিনে পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, প্রথমে বাঁশ ও কাঠসহ বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে একটি মজবুত কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। সেই কাঠামোর ওপর অত্যন্ত সতর্কতার সাথে একের পর এক মটর ডাল বসিয়ে ২০ ফুট উচ্চতার প্রতিমাটি ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে। প্রতিমার শরীরজুড়ে ডালের নিখুঁত বিন্যাসের মাধ্যমে নান্দনিক কারুকাজ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বর্তমানে ডাল বসানোর কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং এখন চলছে প্রতিমার শেষ মুহূর্তের সাজসজ্জা ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ।

মন্দির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ জানান, দেশের বিভিন্ন জেলায় জাঁকজমকপূর্ণ ও ব্যয়বহুল দুর্গাপূজার আয়োজনের পাশাপাশি শরীয়তপুরের পূজামণ্ডপগুলোতেও প্রতিবছর নানা বৈচিত্র্য দেখা যায়। প্রতি বছরই জেলার স্থায়ী ও অস্থায়ী মণ্ডপগুলো বর্ণিল আলোকসজ্জা এবং নানারকম কারুকাজে সাজানো হয়। তবে এবার নড়িয়ার ঘোষপাড়া শ্রী শ্রী রাধাগোবিন্দ ধাম দুর্গামন্দিরে মটর ডাল দিয়ে প্রতিমা তৈরির এই উদ্যোগটি দর্শনার্থীদের মাঝে আলাদা আকর্ষণ তৈরি করেছে।

খুলনার পাইকগাছা থেকে আসা প্রধান প্রতিমাশিল্পী রাজিব সরদার গত পাঁচ বছর ধরে এই মন্দিরে প্রতিমা তৈরির দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে প্রতিমা নির্মাণের সাথে যুক্ত এই শিল্পী এবারই প্রথম মটর ডাল ব্যবহারের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন।

রাজিব সরদার বলেন, “প্রায় ২৫ বছর ধরে প্রতিমা তৈরির কাজ করছি। সাধারণত মাটি, রং আর তুলির আঁচড়ে প্রতিমাকে ফুটিয়ে তুলি। তবে এবার দর্শনার্থীদের জন্য নতুন কিছু করার ভাবনা থেকেই মটর ডাল দিয়ে প্রতিমা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছি।”

তিনি আরও বলেন, “কাজটি বেশ কঠিন ও সময়সাপেক্ষ। প্রতিটি ডাল যত্ন করে বসাতে হচ্ছে, যাতে প্রতিমার সৌন্দর্য ও নিখুঁত কারুকাজ বজায় থাকে। প্রায় তিন মাস ধরে আমরা কাজ করছি। আশা করছি, ব্যতিক্রমী এই প্রতিমা দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করবে এবং দেশজুড়ে আলাদা পরিচিতি পাবে।”

প্রতিমাটি দেখতে আসা দর্শনার্থী ইতি ঘোষ জানান, এই মন্দিরে প্রতিবছরই প্রতিমা তৈরিতে নতুনত্ব আনার চেষ্টা করা হয়। এবার মটর ডাল দিয়ে প্রতিমা তৈরি করা হয়েছে, যা সত্যিই ব্যতিক্রমী। তিনি বলেন, “প্রতিমার কারুকাজ খুব সুন্দর হয়েছে। বিশেষ করে মায়ের মুখের গড়ন আমার কাছে অসাধারণ লেগেছে। এমন প্রতিমা সচরাচর দেখা যায় না।”

মন্দির কমিটির সভাপতি লালা ঘোষ জানান, তারা প্রতি বছরই মন্দিরে ব্যতিক্রমী কিছু করার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, “আমরা প্রতি বছরই আমাদের মন্দিরে ব্যতিক্রমী কিছু করার চেষ্টা করি। গত বছর ধান দিয়ে প্রতিমা তৈরি করেছিলাম। এবার সেই ধারাবাহিকতায় মটর ডাল দিয়ে প্রতিমা নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে অন্তত এক মণ ডাল লাগছে। প্রতিমা নির্মাণ ও সাজসজ্জা মিলিয়ে প্রায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয় হবে।”

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ শরীয়তপুর জেলা শাখার যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক সত্যজিৎ ঘোষ জানান, এ বছর জেলায় মোট ১০২টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা উদযাপিত হবে। পূজা উপলক্ষে জেলার প্রতিটি মণ্ডপে এখন প্রস্তুতি চলছে। সবার সহযোগিতায় আনন্দঘন ও উৎসবমুখর পরিবেশে পূজা উদযাপিত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

জেলা পূজা উদযাপন পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, আগামী ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠীপূজার মধ্য দিয়ে শরীয়তপুরে দুর্গাপূজা শুরু হবে। জেলার ১০২টি মন্দির ও মণ্ডপে এবার পূজা অনুষ্ঠিত হবে। আয়োজকদের প্রত্যাশা, নড়িয়ার ঘোষপাড়া শ্রী শ্রী রাধাগোবিন্দ ধাম দুর্গামন্দিরের এই মটর ডালের প্রতিমাটি এবারের পূজার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হয়ে উঠবে।