শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলায় একটি নির্বাচনি বিলবোর্ড স্থাপনকে কেন্দ্র করে জুলাই বিপ্লবের শহীদ পরিবারের সদস্যকে লাঞ্ছিত করা এবং পরবর্তীতে নড়িয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) হুমকি দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় বিএনপি নেতা মতিউর রহমান সাগরের বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত মতিউর রহমান সাগর বর্তমানে নড়িয়া উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এবং ঘড়িষার ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী হিসেবে পরিচিত।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওসির উদ্দেশ্যে দেওয়া হুমকির একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় জনমনে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, গত সোমবার বিকেলে নড়িয়া উপজেলার নোয়াদ্দা বাংলাবাজার এলাকায় একটি নির্বাচনি বিলবোর্ড স্থাপন করতে যান মতিউর রহমান সাগর। ওই জমির মালিক এবং জুলাই আন্দোলনে শহীদ মিরাজুল ইসলাম অর্ণবের বাবা আবু তালেব বিলবোর্ড স্থাপনে বাধা প্রদান করেন। এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে উভয়ের মধ্যে তীব্র বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয় এবং একপর্যায়ে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।
খবর পেয়ে অর্ণবের চাচা আব্দুস সালাম দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছালে তাকেও মারধর করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। এরপর বিএনপি নেতা সাগর তাকে ‘ফ্যাসিস্ট’ এবং আওয়ামী লীগ সমর্থক হিসেবে আখ্যা দিয়ে একটি বিস্ফোরক মামলায় অজ্ঞাতনামা আসামি হিসেবে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে থানায় সোপর্দ করার চেষ্টা করেন।
তবে থানা পুলিশ প্রাথমিক তদন্ত শেষে জানতে পারে যে, এই ঘটনায় আব্দুস সালামের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। সেই প্রেক্ষিতে পুলিশ তাকে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পুলিশের এই সিদ্ধান্তে ক্ষিপ্ত হয়ে নড়িয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনোয়ার হোসেনের উদ্দেশ্যে মতিউর রহমান সাগর বলেন, ‘বাহার গেছে যে পথে, আপনিও যাবেন সে পথে।’
ঘটনার শিকার আব্দুস সালাম জানান, “আমার ভাইয়ের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডা পর সাগরের ৮-১০ জন লোক আমার ওপর হামলা চালায়। আমাকে যুবলীগের ট্যাগ দিয়ে থানায় আটকে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। আমি এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও মতিউর রহমান সাগরের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।”
নড়িয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মহিউদ্দিন মিরাজ মুক্তকণ্ঠকে জানান, ঘটনাস্থলে ভুক্তভোগী আব্দুস সালামের সরাসরি সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তবে তিনি আরও বলেন, “দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশের সঙ্গে এ ধরনের আচরণ দুঃখজনক। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সাগরের এই কর্মকাণ্ডের পর তার নিজ দলের নেতাকর্মীদের মধ্যেও তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ঘড়িষার ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং শহীদ অর্ণবের মামা আল আমীন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্যকে রাজনৈতিক ট্যাগ দেওয়ার চেষ্টা বিএনপির ভাবমূর্তি দারুণভাবে ক্ষুণ্ন করেছে। সাগরের এসব বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য তাকে বাংলাবাজার এলাকায় অবাঞ্ছিত ঘোষণা করছি এবং দ্রুত সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।”
জেলা বিএনপির সভাপতি ও শরীয়তপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য শফিকুর রহমান কিরণ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “প্রশাসনের সঙ্গে এ ধরনের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ কোনোভাবেই কাম্য নয়। এর আগেও তার বিরুদ্ধে ইউএনও, এসিল্যান্ড ও এসপির বিরুদ্ধে অশোভন আচরণের অভিযোগ ছিল, যার তদন্ত প্রতিবেদন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনাটি তদন্ত করে আগামী দুই দিনের মধ্যে কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এদিকে, মঙ্গলবার বিকেলে মতিউর রহমান সাগরের এই বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে ঘড়িসার বাংলাবাজার এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে মতিউর রহমান সাগরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ওসির সঙ্গে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার কথা অস্বীকার করেন এবং দ্রুত ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এর আগেও সাংবাদিক এবং প্রশাসনের বিভিন্ন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের হুমকি দেওয়ার ঘটনায় সাগরের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় অন্তত ছয়টি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে।