প্রিমিয়ার লিগে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর প্রথমবার মাঠে নামতেই লিভারপুল সমর্থকদের তীব্র বিদ্রূপের মুখে পড়েছে ম্যানচেস্টার সিটি। রোববার রাতে অ্যানফিল্ডে অনুষ্ঠিত ম্যাচে স্বাগতিক সমর্থকেরা ব্যানার ও স্লোগানের মাধ্যমে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তবে সেই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই ম্যানচেস্টার সিটি সমর্থকদের হাতে দেখা গেল এক অদ্ভুত দৃশ্য—শত শত হলুদ রঙের ফোলানো কলা। অনেকের মনেই প্রশ্ন জেগেছে, কেন এই কলার প্রদর্শনী? এর সঙ্গে কি বর্তমান আর্থিক বিতর্কের কোনো সম্পর্ক রয়েছে?
আসলে কলার এই প্রদর্শনী আর্থিক বিতর্কের জবাব দেওয়ার জন্য হঠাৎ তৈরি করা কোনো কৌশল নয়। এর উৎস লুকিয়ে আছে প্রায় ৪০ বছর আগের ম্যানচেস্টার সিটির সমর্থক-সংস্কৃতিতে। তবে লিভারপুলের মাঠে এই পুরোনো ঐতিহ্যকে পুনরায় ফিরিয়ে আনার পেছনে ছিল একটি বিশেষ বার্তা।
ঘটনাটি ১৯৮৭ সালের। সে বছর ম্যানচেস্টার সিটির এক সমর্থক, ফ্র্যাঙ্ক নিউটন, ক্লাবের তৎকালীন মাঠ মেইন রোডে একটি ফোলানো কলা নিয়ে হাজির হয়েছিলেন। নিছক মজার ছলে শুরু হওয়া এই বিষয়টি খুব দ্রুতই গ্যালারির দর্শকদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ঠিক একই সময়ে সিটির সমর্থকদের অত্যন্ত প্রিয় খেলোয়াড় ছিলেন স্ট্রাইকার ইমরে ভারাদি। এক ম্যাচে তাঁকে বদলি হিসেবে মাঠে নামানোর দাবি জানাতে গিয়ে সমর্থকেরা স্লোগানের মাধ্যমে তাঁর নামের সঙ্গে কলা শব্দটি জুড়ে দেন—‘ইমরে ব্যানানা’।
ভারাদির এই বিশেষ ডাকনাম এবং ফোলানো কলার সংমিশ্রণে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে সিটি সমর্থকদের এক ব্যতিক্রমী ঐতিহ্য। এরপর থেকে গ্যালারিতে নিয়মিত দেখা যেতে থাকে অসংখ্য হলুদ রঙের ফোলানো কলা। আশির দশকের শেষ দিকে এই প্রথা আরও জনপ্রিয় হয়। সে সময় ইংলিশ ফুটবলের দ্বিতীয় বিভাগে খেলছিল ম্যানচেস্টার সিটি। সাফল্যের চেয়ে সংগ্রামই ছিল বেশি, কিন্তু সমর্থকদের উচ্ছ্বাসে কোনো কমতি ছিল না। সেই কঠিন সময়েও গ্যালারিতে হাস্যরস এবং উদ্দীপনা ধরে রাখার একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছিল এই কলা প্রদর্শনী।
সাম্প্রতিক এই কলা প্রদর্শনের পেছনে যেমন অতীতের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে, তেমনি বর্তমান বিতর্কের মুখে একটি শক্ত বার্তা দেওয়া হয়েছে। সিটির সমর্থকগোষ্ঠী ‘১৮৯৪ গ্রুপ’-এর উদ্যোগে লিভারপুলের মাঠে পুরোনো দিনের সেই আবহ ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানানো হয়েছিল। ভ্রমণকারী সমর্থকদের জন্য বিশেষ পরিকল্পনায় ছিল রেট্রো জার্সি এবং সেই পরিচিত ফোলানো কলা।
উল্লেখ্য, প্রিমিয়ার লিগের আর্থিক নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগে একটি স্বাধীন কমিশন ম্যানচেস্টার সিটিকে দোষী সাব্যস্ত করেছে। তবে ক্লাবটি এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে এবং কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করেছে। এই টানটান পরিস্থিতির মধ্যে অ্যানফিল্ডে লিভারপুল সমর্থকদের বিদ্রূপের জবাব নিজেদের নিজস্ব ঢঙে দিতে চেয়েছেন সিটির সমর্থকেরা।
ম্যানচেস্টার ইভনিং নিউজকে ১৮৯৪ গ্রুপের একজন প্রতিনিধি বলেছেন, ‘আমরা সবাইকে মনে করিয়ে দিতে চাই, আমরা যে লিগেই খেলি না কেন, সব সময় সিটির পাশে থাকব।’
এই বক্তব্যের পেছনে গভীর তাৎপর্য রয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত রাজপরিবারের বিপুল অর্থ বিনিয়োগের মাধ্যমে সিটির উত্থান, প্রিমিয়ার লিগে একের পর এক শিরোপা জয় কিংবা ইউরোপীয় ফুটবলে প্রভাব বিস্তারের অনেক আগে থেকেই এই ক্লাবের একটি সমৃদ্ধ ইতিহাস ছিল। আশির দশকের শেষ দিকে দ্বিতীয় বিভাগে টানা দুই মৌসুম কাটিয়েছে সিটি, এমনকি পরবর্তীতে তৃতীয় বিভাগেও খেলতে হয়েছে তাদের। সেই দুঃসময়েও যাঁরা ক্লাবের পাশে অবিচল ছিলেন, কলা ফিরিয়ে এনে সমর্থকেরা মূলত তাঁদের সেই নিঃস্বার্থ সমর্থনকেই স্মরণ করতে চেয়েছেন।
আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে যখন সিটিকে ঘিরে সমালোচনার ঝড় বইছে, তখন সমর্থকেরা এটি বুঝিয়ে দিতে চেয়েছেন যে, ক্লাবের প্রতি তাঁদের ভালোবাসা কেবল শিরোপা, তারকা খেলোয়াড় কিংবা বিত্তশালী মালিকানার ওপর নির্ভরশীল নয়। ক্লাবটি যে পরিস্থিতিরই মুখোমুখি হোক না কেন, তাঁরা সবসময় পাশে থাকবেন।