নাটোর রেলস্টেশনে গত ৭ অক্টোবর বিকেলে ট্রেনের টিকিট সংগ্রহের সময় ল্যাপটপ ও ক্যামেরা হারিয়েছিলেন জার্মান নাগরিক ক্রিল ল্যান্ডার। বাংলাদেশে ভ্রমণে আসা এই তরুণের সাথে ঘটে যাওয়া এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং সাধারণ মানুষের মাঝে তাঁর প্রতি গভীর সহানুভূতি তৈরি হয়।

সম্প্রতি ফেসবুকে একটি ছবি ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে একজন পুলিশ সদস্য জার্মান এই তরুণের হাতে তাঁর হারিয়ে যাওয়া ল্যাপটপ ও ক্যামেরা ফিরিয়ে দিচ্ছেন। ওই ছবিটির ক্যাপশনে লেখা ছিল, ‘ল্যাপটপ ও ক্যামেরা ফেরত পেলেন জার্মানি পর্যটক। বাংলাদেশ টুরিস্ট পুলিশকে ধন্যবাদ আমাদের দেশের সম্মান রাখার জন্য!’

একই ধরনের দাবি করে শাহিন রেজা নামক একটি ফেসবুক পেজ থেকে ১০ সেকেন্ডের একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়। ভিডিওটির ক্যাপশনে উল্লেখ করা হয়, ‘অবশেষে ল্যাপটপ, ক্যামেরা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ফিরে পেয়ে মহাখুশি জার্মান পর্যটক!’ ভিডিওটিতে দেখা যায়, জিনিসপত্র ফেরত পেয়ে ওই জার্মান তরুণ অত্যন্ত খুশিতে বাংলা ভাষায় কথা বলছেন। প্রতিবেদনটি লেখা পর্যন্ত ভিডিওটি ৬ লাখ ৩৫ হাজার বার দেখা হয়েছে এবং প্রায় ২০ হাজার মানুষ এতে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।

তবে তথ্যের সত্যতা যাচাই করে দেখা গেছে, জার্মান পর্যটকের চুরি যাওয়া মালামাল ফেরত পাওয়ার দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও ভুল। তাঁর ল্যাপটপ ও ক্যামেরা এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই ছবি ও ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে।

ঘটনাটির সত্যতা যাচাইয়ে প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড দিয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা যায়, এই চুরির বিষয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, পুলিশ এখনো ক্রিলের মালামাল উদ্ধার করতে পারেনি। নাটোর রেলওয়ে স্টেশনের সিসিটিভি ফুটেজে এক ব্যক্তিকে ল্যাপটপ ও ক্যামেরার ব্যাগ নিয়ে যেতে দেখা গেছে। পুলিশ বর্তমানে ওই ব্যক্তিকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের পাশাপাশি মালামাল উদ্ধারে বিভিন্ন ইউনিটের মাধ্যমে কাজ করছে।

রাজশাহী রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাফিজুর রহমান এই বিষয়ে বলেন, “পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে চুরি যাওয়া মালামাল উদ্ধারের চেষ্টা করছে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।”

এদিকে, ক্রিল ল্যান্ডারের প্রতি সহমর্মিতা জানিয়ে এক ব্যবসায়ী তাঁকে নতুন ল্যাপটপ উপহার দিয়েছেন। ‘ছেলেটা ভালো স্মৃতি নিয়ে ফিরুক’, এই শিরোনামের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, ১০ অক্টোবর সন্ধ্যায় রাজধানীর হাজারীবাগ থানায় পুলিশের উপস্থিতিতে ১৮ বছর বয়সী ক্রিলের হাতে একটি ম্যাকবুক তুলে দেন ব্যবসায়ী মুক্তি মাহমুদ।

মুক্তি মাহমুদ বলেন, “সবার পক্ষ থেকে একটি ম্যাকবুক উপহার দিয়েছি। বাংলাদেশ ছাড়ার আগে ছেলেটা একটু হলেও যেন ভালো স্মৃতি নিয়ে ফিরতে পারে।” তিনি আরও জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্রিলের ল্যাপটপ ও ক্যামেরা চুরির খবর এবং থানায় বসে তাঁর কান্নার ভিডিও দেখে তিনি মর্মাহত হয়েছিলেন, তাই এই উপহার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

নতুন ম্যাকবুক পেয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে ক্রিল ল্যান্ডার বলেন, জিনিসপত্র হারানোর পর থেকে অনেকেই তাঁকে বিভিন্নভাবে সাহায্য করেছেন এবং সহানুভূতি জানিয়েছেন। নতুন এই ম্যাকবুক পাওয়ায় তিনি পুনরায় তাঁর কাজ শুরু করতে পারবেন বলে জানান।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ল্যাপটপ ও ক্যামেরা ফেরত পাওয়ার যে দাবি করা হয়েছে, তার সপক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। নাটোরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরিফুল হক মুক্তকণ্ঠকে নিশ্চিত করেছেন যে, রোববার দুপুর পর্যন্ত জার্মান পর্যটকের চুরি হওয়া ল্যাপটপ ও ক্যামেরা উদ্ধার হয়নি।

ছড়িয়ে পড়া ছবিগুলো বিশ্লেষণ করে বেশ কিছু অসংগতি ধরা পড়েছে। ছবিতে পুলিশ সদস্যের কাঁধের ব্যাজ, হাতার প্রতীক এবং পোশাকের বিভিন্ন স্থানে থাকা লেখার অক্ষরবিন্যাস ও নকশা অত্যন্ত অস্বাভাবিক। বিশেষ করে প্রতীকের সূক্ষ্ম বিবরণগুলো অস্পষ্ট এবং লেখাগুলো এলোমেলো, যা সাধারণত এআই দিয়ে তৈরি ছবিতে দেখা যায়। একইভাবে ভিডিওটিতে ক্রিল ল্যান্ডারকে বাংলা বলতে শোনা গেলেও পেছনের রেলস্টেশনের সাইনবোর্ডের অক্ষরবিন্যাস অদ্ভুত, যা এআই ভিডিওর একটি বৈশিষ্ট্য।

সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী মালামাল উদ্ধার হয়নি, অথচ ফেসবুকে বিপরীত দাবি করা হচ্ছে। বিষয়টি আরও নিশ্চিত হতে হাইভ মডারেশন এবং সাইট ইঞ্জিন টুলের মতো এআই শনাক্তকারী সফটওয়্যার ব্যবহার করে বিশ্লেষণ করা হয়। এর ফলাফলে দেখা যায়, ওই ছবি ও ভিডিও উভয়ই এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।