বাংলাদেশে ভ্রমণের সময় ল্যাপটপ ও ক্যামেরা হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন জার্মান পর্যটক ক্রিল ল্যান্ডার। তাঁর এই দুঃসহ পরিস্থিতির কথা জানতে পেরে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর কান্নার ভিডিও দেখে আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠেন রাজধানীর এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মুক্তি মাহমুদ। নিজের ছেলের কথা মনে করে ক্রিল ল্যান্ডারকে একটি নতুন ম্যাকবুক উপহার দিয়েছেন তিনি।

আজ শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর হাজারীবাগ থানায় পুলিশের উপস্থিতিতে ১৮ বছর বয়সী ক্রিলের হাতে ম্যাকবুকটি তুলে দেন মুক্তি মাহমুদ। তাঁর একান্ত চাওয়া ছিল, এই তরুণ পর্যটক যেন বাংলাদেশ থেকে ফেরার আগে অন্তত কিছু ইতিবাচক ও সুন্দর স্মৃতি সাথে করে নিয়ে যেতে পারেন।

মুক্তি মাহমুদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, কয়েক দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্রিলের ল্যাপটপ ও ক্যামেরা চুরি যাওয়ার খবর দেখছিলেন তিনি। একপর্যায়ে থানায় বসে তাঁর কান্নার ভিডিও চোখে পড়ে। সেটি দেখে মর্মাহত হন।

মুক্তি মাহমুদ বলেন, ‘বাংলাদেশে এসে ১৮ বছর বয়সী এক বিদেশি পর্যটকের জিনিসপত্র চুরি হয়ে যাওয়াটা আমাদের জন্য লজ্জার। বিষয়টি আমার খুব খারাপ লেগেছে। ওর বয়সী আমারও একটা ছেলে আছে। সে (ছেলে) বিদেশে পড়াশোনা করে। ছেলের কথা মনে হওয়ায় ঘটনাটি আমাকে আরও নাড়া দেয়।’

ভিডিওটি দেখার পর থেকেই ক্রিলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছিলেন বলে জানান মুক্তি মাহমুদ। পরবর্তীতে শাওন নামের একজনের মাধ্যমে যোগাযোগ করে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন তিনি।

মুক্তি মাহমুদ বলেন, ‘সবার পক্ষ থেকে একটি ম্যাকবুক উপহার দিয়েছি। বাংলাদেশ ছাড়ার আগে ছেলেটা একটু হলেও যেন ভালো স্মৃতি নিয়ে ফিরতে পারে।’

রাজধানীর জিগাতলা এলাকায় বসবাসকারী মুক্তি মাহমুদ দীর্ঘ সময় লন্ডনে অবস্থান করেছেন। বর্তমানে তিনি আনজুমান ডিজাইনারস লিমিটেড নামক প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ বিভাগের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত আছেন।

মুক্তি মাহমুদ জানান, তাঁর অনেক বিদেশি বন্ধু ক্রিলের জিনিসপত্র চুরির ঘটনাটি জেনে বিব্রত বোধ করেছেন। তাঁর মতে, এ ধরনের অপরাধ দেশের ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করে। সেই চিন্তা থেকেই ক্রিলের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি।

নতুন ম্যাকবুকটি পেয়ে গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন ক্রিল ল্যান্ডার। তিনি বলেন, ‘জিনিসপত্র হারানোর পর থেকে অনেকেই আমাকে নানাভাবে সাহায্য করেছেন। সহানুভূতি প্রকাশ করেছেন। সত্যিই এটি প্রশংসা করার মতো। আজ একটি ম্যাকবুক পেলাম। ধন্যবাদ জানাচ্ছি। এটা ব্যবহার করে আবার কাজ করতে পারব। এ ঘটনা আমার জীবনের অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে থাকবে।’

হাজারীবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোশাররফ হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ক্রিল পড়াশোনার পাশাপাশি খণ্ডকালীন চাকরি করে নিজের ল্যাপটপটি কিনেছিলেন। সেটি চুরি হয়ে যাওয়ার ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক।

ওসি বলেন, ‘ল্যাপটপ ও ক্যামেরা হারানোর ঘটনাটি আমাদের জন্য লজ্জার। পুলিশ চুরি হওয়া মালামাল উদ্ধারের চেষ্টা করছে। একজন নিজের উদ্যোগে তাঁকে ম্যাকবুক উপহার দিয়েছেন। এতে কিছুটা হলেও দেশের সম্মান ফিরবে।’

তবে নতুন ম্যাকবুক উপহার পেলেও ক্রিলের চুরি যাওয়া ল্যাপটপ ও ক্যামেরা এখনো উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। নাটোর রেলওয়ে স্টেশনের সিসিটিভি ফুটেজে এক ব্যক্তিকে ক্রিলের ল্যাপটপ ও ক্যামেরার ব্যাগ নিয়ে যেতে দেখা গেছে। ওই ব্যক্তিকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের পাশাপাশি চুরি যাওয়া মালামাল উদ্ধারে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট নিরলসভাবে কাজ করছে।

রাজশাহী রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাফিজুর রহমান গতকাল শুক্রবার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে চুরি যাওয়া মালামাল উদ্ধারের চেষ্টা করছে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

ঘটনাটি ঘটে গত বুধবার বিকেলে। নাটোর রেলওয়ে স্টেশনে ট্রেনের টিকিট কেনার জন্য এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলতে যাচ্ছিলেন ক্রিল। এ সময় ট্রেনের কর্মকর্তা পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তির কাছে তিনি তাঁর ল্যাপটপ ও ক্যামেরার ব্যাগটি রেখে যান। টাকা তুলে ফিরে এসে তিনি দেখেন, ওই ব্যক্তি এবং তাঁর ব্যাগ—উভয়ই নিখোঁজ। পরে তিনি জানতে পারেন, ওই ব্যক্তি রেলওয়ের কোনো কর্মী নন।

এরপর ক্রিল ল্যান্ডার নাটোর সদর থানায় গিয়ে বিষয়টি জানান। চুরি যাওয়া মালামাল উদ্ধারের আশায় বুধবার দিবাগত রাতে তিনি রাজশাহীতে যান। সেখানে পুলিশ তাঁর থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করে। পরদিন বৃহস্পতিবার বিকেলে পদ্মা এক্সপ্রেস ট্রেনে করে তিনি ঢাকায় আসেন।

চুরি যাওয়া ল্যাপটপ ও ক্যামেরা এখনো ফিরে পাননি ক্রিল। তবে নতুন ম্যাকবুক পেয়ে তিনি পুনরায় কাজ শুরু করতে পারবেন বলে জানিয়েছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশে এসে মানুষের কাছ থেকে যে সহায়তা ও সহানুভূতি পেয়েছেন, সেই অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকবে বলে জানান এই জার্মান তরুণ।