জরাজীর্ণ এক বসতবাড়িতে চলছে বিয়ের উৎসব। এই বিশেষ আয়োজন উপলক্ষে বাড়ির সামনেই নির্মাণ করা হয়েছে একটি সুদৃশ্য ফটক। পাশেই শামিয়ানার নিচে অতিথিদের বসার জন্য সাজানো সারি সারি চেয়ার ও টেবিল। অন্য একপাশে ব্যস্ততা চলছে বিভিন্ন মুখরোচক খাবার তৈরির। সুসজ্জিত আসনে বসে আছেন কনে, আর চারদিকে স্বজনদের আনন্দ উল্লাসে মুখরিত পরিবেশ।

গত শুক্রবার নওগাঁ জেলার মান্দা উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামের বাসিন্দা ভ্যানচালক আফছার আলীর বাড়িতে এই আনন্দঘন বিয়ের আয়োজন করা হয়। তাঁর ২০ বছর বয়সী মেয়ে আফসানা মিমির সঙ্গে বিয়ে হয়েছে নাটোর সদর উপজেলার সবুজ মন্ডলের ছেলে ২২ বছর বয়সী কাউছার মন্ডলের। বাহ্যিকভাবে এই বিয়ের আয়োজন আর দশটি সাধারণ বিয়ের মতোই মনে হলেও এর পেছনে রয়েছে এক অসাধারণ গল্প। কারণ, এই পুরো আয়োজনের কারিগর বর বা কনের পরিবারের কেউ নন, এমনকি তাঁদের সঙ্গে তাঁর পূর্বপরিচিত কোনো সম্পর্কও ছিল না। এই মহৎ উদ্যোগের নায়ক নাটোরের বড়াইগ্রামের ব্যবসায়ী রুহুল আমিন।

অসহায় ও দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের আনন্দঘন পরিবেশে বিয়ে সম্পন্ন করে দেওয়া এখন রুহুল আমিনের নেশায় পরিণত হয়েছে। গত ২৪ বছরে তিনি এ পর্যন্ত মোট ১১২ জন হতদরিদ্র মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। বিয়ের উপহারসামগ্রীসহ যাবতীয় যাবতীয় ব্যয়ভার তিনি এককভাবে বহন করে আসছেন।

কনে আফসানা মিমি জানান, টাকার অভাবে তাঁর বাবা বিয়ে ঠিক করার সাহস পাচ্ছিলেন না। পরবর্তীতে এক প্রতিবেশীর মাধ্যমে খবর পেয়ে বাবা রুহুল আমিনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি নিজের মেয়ের মতোই এই বিয়ের সব আনুষ্ঠানিকতার আয়োজন করেছেন। রুহুল আমিনের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে আফসানা বলেন, সমাজে এ ধরনের মানুষ থাকতে পারে, তা তিনি চিন্তাও করেননি।

বাবা আফছার আলীর ভাষ্যমতে, তিনি গ্রামের রাস্তায় ভ্যান চালিয়ে কোনোমতে সংসার চালান। চরম অর্থকষ্টের কারণে মেয়ের বিয়ের উদ্যোগ নিতে পারছিলেন না তিনি। হঠাৎ লোকমুখে বড়াইগ্রামের ব্যবসায়ী রুহুল আমিনের কথা জানতে পারেন। এরপর তাঁর সঙ্গে দেখা করে মেয়ের বিয়ের জন্য সহযোগিতা চান আফছার। ওই ব্যবসায়ী তাঁকে আশ্বস্ত করেন।

কিছুদিনের মধ্যেই নাটোর সদরের কাউছার আলীর সঙ্গে মেয়ের বিয়ের কথাবার্তা পাকাপাকি করে রুহুল আমিনকে জানান আফছার। এরপর রুহুল আমিন নিজে উপস্থিত থেকে মেয়ের গায়েহলুদের পোশাক, বর-কনের বিয়ের পোশাক, গয়নাপত্র, উপহারসামগ্রী, সাজসজ্জা ও খাবারের আয়োজন করেন। এসবের যাবতীয় খরচ তিনি নিজেই বহন করেছেন।

বর কাউছার মণ্ডল বলেন, “আমি সৌভাগ্যবান এমন একটি বিয়ের বর হতে পেরে। রুহুল আমিন আমার বিয়ের উকিল বাবা হয়েছেন। আমার স্ত্রীকে আমার হাতে সঁপে দিয়েছেন। আমাদের জন্য দোয়া করেছেন।”

পেশায় ইলেকট্রনিক সামগ্রীর ব্যবসায়ী রুহুল আমিন তাঁর করা প্রতিটি বিয়ের দিন-তারিখ এবং স্থান যত্ন করে লিখে রাখেন। অনেক বিয়ের ছবি ও ভিডিও তাঁর সংগ্রহে রয়েছে। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি নিজে এক মেয়ের বাবা।

মুক্তকণ্ঠকে রুহুল আমিন বলেন, “এই পৃথিবীতে অনেকের অনেক রকম শখ রয়েছে। আমি আমার উপার্জিত অর্থ দিয়ে সমাজের হতদরিদ্র মেয়েদের বিয়ে সম্পন্ন করে দিতে চাই। এটাই আমার শখ। এর বিনিময়ে এ জীবনে কিছুই চাই না। সৃষ্টিকর্তা পরকালে আমাকে নিশ্চয় প্রতিদান দেবেন। আমি এ পর্যন্ত ১১৩ জন মেয়েকে বিয়ে দিলাম। আমি মনে করি আমি ১১৩ জন মেয়ের বাবা। ওরা আমার মেয়ে-জামাই। আমার নিজের একটি মেয়ে রয়েছে।”

রুহুল আমিনের এই মানবিক উদ্যোগের তালিকায় গত ২১ আগস্ট যুক্ত হয় রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার বালাদিয়া গ্রামের সুমাইয়া আক্তারের বিয়ে, যা ছিল ১১২তম বিয়ে। সুমাইয়া জানান, ১০ বছর আগে তাঁর বাবা মারা যান। এরপর নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে তিনি বড় হন। মেয়ের বিয়ে নিয়ে তাঁর মা ভীষণ দুশ্চিন্তায় ছিলেন। এক প্রতিবেশীর মাধ্যমে রুহুল আমিনের সঙ্গে যোগাযোগ হলে তাঁর উদ্যোগেই ধুমধাম করে সুমাইয়ার বিয়ে সম্পন্ন হয়।

এর আগে গত ২১ জুন ১০৯তম বিয়ে হয় নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের ঈশানগাতি গ্রামের জালাল মোল্লার মেয়ে রাবেয়া খাতুনের। রাবেয়া খাতুন বলেন, “আট বছর আগে ক্যানসার আক্রান্ত হয়ে আমার বাবা মারা যান। আমার বিয়ে নিয়ে পরিবার অনেক দুশ্চিন্তায় ছিল। অবশেষে রুহুল আমিন ভাইয়ের সহযোগিতায় জাঁকজমকপূর্ণভাবেই আমার বিয়ে হয়। আমার পুরো পরিবার তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ। এখনো তিনি আমাদের খোঁজখবর নেন।”

রুহুল আমিনের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের প্রশংসা করছেন অনেকেই। ওয়ালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাকিম বলেন, রুহুল আমিন ওয়ালিয়া বাজারের একজন ব্যবসায়ী। তিনি মাঝেমধ্যেই গরিব-দুঃখী মেয়েদের বিয়েতে সহযোগিতা করেন। নিজে উপস্থিত থেকে ধুমধাম করে নিজের মেয়ের মতোই বিয়ে দেন। পুরো বিয়ের খরচ বহন করেন। কাবিনে নিজে সাক্ষী হন। তাঁর এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে মহৎ কাজ।

বড়াইগ্রামের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, “স্থানীয় লোকজনের কাছে রুহুল আমিনের উদ্যোগে ১১২তম মেয়ের বিয়ে দেওয়ার কথা শুনেছি। অসহায় পরিবারের মেয়েদের বিয়েতে এ ধরনের সহযোগিতা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তাঁর এই মানবিক কর্মকাণ্ড সমাজের অন্য বিত্তবানদেরও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে উৎসাহিত করবে।”