রাজধানীর আবদুল গনি রোডে অবস্থিত বর্তমান সচিবালয় প্রাঙ্গণে আর কোনো নতুন ভবন নির্মাণ করা হবে না। পরিবর্তে পুরো সচিবালয়কে শেরেবাংলা নগরে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গত বুধবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় সরকার সচিবালয় স্থানান্তরের এই নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত ওই বিশেষ সভায় গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, গণপূর্ত অধিদপ্তর এবং স্থাপত্য অধিদপ্তরের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সিদ্ধান্তের পরপরই তৎপরতা শুরু করেছে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। পরদিনই সচিবালয় স্থানান্তরের একটি প্রকল্প বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) অন্তর্ভুক্ত করার জন্য পরিকল্পনা কমিশনকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। আগামী সপ্তাহে পরিকল্পনা কমিশনে এই প্রকল্পের বিষয়ে একটি আন্তমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, সরকার এই প্রকল্পের কাজ যত দ্রুত সম্ভব শুরু করতে আগ্রহী, যাতে বর্তমান সরকারের মেয়াদে দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করা যায়।
বৈঠকে উপস্থিত স্থাপত্য অধিদপ্তরের প্রধান স্থপতি আসিফুর রহমান ভূঁইয়া মুক্তকণ্ঠকে জানান, “সচিবালয়কে শেরেবাংলা নগরে স্থানান্তরের বিষয়ে বৈঠকে স্থাপত্য অধিদপ্তর থেকে তিনটি আলাদা নকশা তুলে ধরা হয়। সেখান থেকে একটি নকশা চূড়ান্তে সবাই একমত হন।”
তিনি আরও বলেন, “এ নকশার ওপর ভিত্তি করে প্রকল্পটি তৈরি করা হবে। নকশাগুলো জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকেও উপস্থাপন করা হবে।”
গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আগে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েও বেশ কয়েকবার শেরেবাংলা নগরে সচিবালয় স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ২০১৫ সালে ২ হাজার ২০৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়, যার কাজ ২০১৮ সালের জুনের মধ্যে শেষ করার কথা ছিল। তখন জিয়া উদ্যানের উত্তর ও বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের পশ্চিম দিকে, যেখানে প্রতিবছর বাণিজ্য মেলা অনুষ্ঠিত হয়, সেই ৩২ একর জমির ওপর সচিবালয় তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছিল। জানানো হয়েছিল, জাতীয় সংসদ ভবনের স্থপতি লুই আই কানের মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী এই সচিবালয় নির্মিত হবে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চার লাখ ডলার ব্যয় করে মার্কিন স্থপতি লুই আই কানের করা জাতীয় সংসদ ভবনসহ পুরো শেরেবাংলা নগরের মূল নকশা দেশে আনা হয়েছিল। সেই নকশা অনুযায়ী, শেরেবাংলা নগরে ১৪ তলা ভিতের ওপর ৯ তলাবিশিষ্ট ৪টি মূল ভবন নির্মাণের কথা ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সেই সময়ে সচিবালয় স্থানান্তর করা সম্ভব হয়নি। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের মেয়াদকালেও সচিবালয় সরানোর বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।
নতুন বিএনপি সরকারের আমলে সচিবালয়ের ভেতরেই ২১ তলা একটি ভবন নির্মাণের জন্য সাড়ে ৬০০ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। তবে গত ২৬ এপ্রিল একনেক সভায় প্রকল্পটি উত্থাপন করা হলে তা অনুমোদন না করে ফেরত পাঠানো হয়। ওই সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সচিবালয়কে শেরেবাংলা নগরে স্থানান্তর করা সম্ভব কি না, তা পর্যালোচনা করতে গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও স্থাপত্য অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেন।
সচিবালয় স্থানান্তরের সম্ভাব্য স্থান নিয়ে গত পাঁচ মাসে অংশীজনদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেছে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রাথমিক সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। পাঁচ মাসব্যাপী পর্যালোচনার পর গত বুধবার প্রধানমন্ত্রীর সামনে একটি প্রতিবেদন পেশ করা হয়। স্থাপত্য অধিদপ্তরের তিনটি দল আলাদা তিনটি নকশা উপস্থাপন করলে প্রধানমন্ত্রী তার মধ্যে একটি নকশা চূড়ান্ত করেন। এরপর ওই নকশার ভিত্তিতে প্রকল্প তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয় গণপূর্ত অধিদপ্তরকে।
প্রস্তাবিত নকশা অনুযায়ী, সচিবালয়ের চারপাশে একটি সার্কুলার বা চক্রাকার সড়ক থাকবে। বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের পেছন দিয়ে একটি সড়ক নির্মাণ করা হবে, যা জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের (সাবেক গণভবন) পাশ দিয়ে মিরপুর সড়কে গিয়ে মিশবে। তবে জাদুঘরের পাশে থাকা স্কুল, হাসপাতাল ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন স্থাপনা সরিয়ে ফেলতে হতে পারে এই সড়ক নির্মাণের জন্য।
গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, বিজয় সরণি থেকে আগারগাঁও হয়ে মিরপুর ১০ নম্বরের দিকে যাওয়া সড়কের নিচ দিয়ে একটি পাতাল সড়ক নির্মাণের আলোচনা চলছে। পরিকল্পনাটি হলো, ওপরের সড়ক দিয়ে প্রস্তাবিত সচিবালয়ে প্রবেশ করা যাবে এবং নিচের পাতাল সড়ক দিয়ে মিরপুর সড়কে যাওয়া যাবে। এর জন্য আলাদা একটি প্রকল্প নেওয়া হতে পারে।
প্রস্তাবিত নকশা অনুযায়ী, সচিবালয়ের প্রতিটি ভবন হবে ১২ তলা এবং এগুলো জাতীয় সংসদের স্থাপত্যশৈলীর সঙ্গে মিল রেখে তৈরি করা হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো মনে করছে, শেরেবাংলা নগরে সচিবালয় স্থানান্তরের পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে যানজট। যদিও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ওই এলাকায় যানজটমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র আরও জানিয়েছে, আবদুল গনি রোড থেকে সচিবালয় সরে গেলে বর্তমান প্রাঙ্গণে ঢাকা জেলা প্রশাসক (ডিসি) অফিস, পুলিশ সুপার (এসপি) অফিসসহ পুরান ঢাকার অন্যান্য সরকারি কার্যালয়গুলো স্থানান্তর করা হতে পারে।
বর্তমান সচিবালয়ে জায়গার অপ্রতুলতার কারণে কর্মকর্তাদের দাপ্তরিক কাজে সমস্যা হয় এবং আশপাশের এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়, যা কর্মঘণ্টার অপচয় ঘটায়। বর্তমান সচিবালয়ের মোট জায়গার পরিমাণ ১৭ লাখ বর্গফুট, যেখানে প্রস্তাবিত নতুন সচিবালয়ে জায়গার পরিমাণ হবে ৩১ লাখ বর্গফুট।
উল্লেখ্য, বাণিজ্য মেলার জন্য ব্যবহৃত জায়গাটি গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে। ২০২১ সালে বাণিজ্য মেলা সরিয়ে পূর্বাচলে নেওয়া হলে মাঠটি খালি পড়ে থাকে। চার বছর আগে এই খালি মাঠে পার্ক তৈরির জন্য ১০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ধারণা, জায়গাটি খালি রাখলে অবৈধ দখলের সম্ভাবনা থাকে, তাই সচিবালয় স্থানান্তর করলে এই ঝুঁকি থাকবে না।
তবে স্থপতি ইকবাল হাবিব মনে করেন, ১৯৬৯ সালে করা লুই কানের নকশার আলোকে ২০২৬ সালে এসে সচিবালয় শেরেবাংলা নগরে স্থানান্তর করা সঠিক হবে না। তাঁর মতে, মালয়েশিয়ার পুত্রজায়ার মতো বাংলাদেশেও সচিবালয় স্থানান্তরের জন্য ভিন্ন কোনো জায়গার কথা চিন্তা করা উচিত।
ইকবাল হাবিব বলেন, “ইতিমধ্যে শেরেবাংলা নগর ও আগারগাঁওয়ে অনেক সরকারি স্থাপনা গড়ে উঠেছে। এমনিতেই সেখানে যানবাহনের সংখ্যা বেড়েছে। নতুন করে সচিবালয় হলে সেখানে যানজটের অবস্থা ভয়াবহ হতে পারে।”