রাজধানীর আবদুল গনি রোডে অবস্থিত বর্তমান বাংলাদেশ সচিবালয় সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সচিবালয়ের নতুন ঠিকানা হবে শেরেবাংলা নগরের পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠ। ২০২৯ সালের মধ্যে নতুন এই স্থাপনায় কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
গতকাল রোববার বিকেলে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে সচিবালয় স্থানান্তরের এই প্রস্তাবটি আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন দেওয়া হয়। পরবর্তীতে সন্ধ্যায় এক সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিসভার এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সম্পর্কে বিস্তারিত জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি। উল্লেখ্য, এর আগে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় সরকার সচিবালয় স্থানান্তরের নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ওই সভায় গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, গণপূর্ত অধিদপ্তর এবং স্থাপত্য অধিদপ্তরের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ওই সভার পরদিনই গণপূর্ত মন্ত্রণালয় পরিকল্পনা কমিশনকে একটি চিঠি দেয়, যাতে সচিবালয় স্থানান্তরের প্রকল্পটিকে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) অন্তর্ভুক্ত করার অনুরোধ জানানো হয়। এখন মন্ত্রিসভার অনুমোদনের ফলে এই প্রক্রিয়াটি আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি জানান, “মূল বিষয়টি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং বলা হয়েছে আরও কিছু পরীক্ষা–নিরীক্ষার কাজ এগিয়ে নিতে। ২০২৯ সালের মধ্যে এটি করার প্রচেষ্টা রয়েছে। এখন ব্যয়ের প্রাক্কলন চলছে।”
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে আবদুল গনি রোডের বাংলাদেশ সচিবালয়ের ১৭ দশমিক ৫৭ একর জায়গার ওপর ১৩টি ভবন অবস্থিত। এর মধ্যে আটটি ভবন স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময়ে নির্মিত। বিশেষ করে সচিবালয়ের পুরোনো ১, ২, ৩ ও ৮ নম্বর ভবনগুলো ১৯৩৭ থেকে ১৯৩৯ সালের মধ্যে এবং ৫ নম্বর ভবনটি ১৯৪৭ সালে তৈরি করা হয়েছে। এই ভবনগুলো ভূমিকম্প সহনীয় করে নির্মাণ করা হয়নি। ঢাকা শহর ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় হওয়ায় এসব পুরনো স্থাপনায় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় বা বিভাগের কার্যক্রম পরিচালনা করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া ভবনগুলোতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য পর্যাপ্ত জায়গার অভাব থাকায় স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ আরও উল্লেখ করেছে যে, ভবনগুলোতে পর্যাপ্তসংখ্যক ওয়াশ-ব্লক নেই। ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী এখানে কর্মরত থাকায় স্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে বাংলাদেশ সচিবালয়ে মোট অফিসের জায়গা প্রায় ১৮ দশমিক ৭৬ লাখ বর্গফুট। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত জায়গার চাহিদা এবং সচিবালয় চত্বরের বাইরে অবস্থিত বিভিন্ন বিভাগকে এক জায়গায় আনার জন্য আরও প্রায় ১০ লাখ বর্গফুটের বেশি অফিস জায়গার প্রয়োজন।
এ বিষয়ে একনেক সভার সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে লুই আই কানের মহাপরিকল্পনা (মাস্টার প্ল্যান) অনুসরণ করে শেরেবাংলা নগরের পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠ প্রাঙ্গণে নতুন সচিবালয় স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। স্থাপত্য অধিদপ্তর এই লক্ষ্যে একটি ধারণাগত স্থাপত্য নকশা প্রণয়ন করেছে। এই নকশা অনুযায়ী, শেরেবাংলা নগরের পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠের প্রায় ৩১ দশমিক ৫৮ একর জায়গায় মোট প্রায় ৩৩ দশমিক ১৬ লাখ বর্গফুট জায়গা-সংবলিত স্থাপনা তৈরি হবে। এখানে তিনটি বেজমেন্টসহ (২০০টি ভূ-উপরিস্থ পার্কিংসহ মোট ৩,৮০০টি গাড়ি পার্কিং) ১৪টি ১২ তলা ভবন নির্মাণ করা হবে। এছাড়া এখানে একটি মসজিদ, ৩৫০ জন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন দুটি মাল্টিপারপাস হল, একটি ক্যাফেটেরিয়া এবং একটি ডাকঘর থাকবে। পুরো প্রকল্প এলাকার প্রায় ৩০ শতাংশ জায়গায় সবুজায়ন ও জলাধারের সংস্থান রাখা হয়েছে।
সচিবালয় সরিয়ে নেওয়ার পর বর্তমান আবদুল গনি রোডের স্থাপনাটির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি বলেন, “ভবিষ্যতে ভালো কিছু হতে পারে। পুরোনো ঢাকায় প্রশাসনিক ও বিচার (জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও অধস্তন আদালত) কাজ হয়। সেগুলো আসতে পারে বা অন্যান্য আরও কিছু অফিস এখানে আসতে পারে।” তবে বর্তমান জায়গায় ঠিক কী হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলতে পারেননি তিনি।