কুমিল্লায় ধর্ষণের পর নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার কিশোরী জান্নাতুল তাজমিন (১৫) কক্সবাজারে একটি আবাসিক হোটেলে রিয়াজ উদ্দিন ওরফে রাজুর সঙ্গে ‘স্ত্রী’ পরিচয়ে এক রাত অবস্থান করেছিলেন। হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজ এবং নিবন্ধন খাতা যাচাই করে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
হোটেল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৬ অক্টোবর কক্সবাজারের কলাতলী এলাকার একটি হোটেলের ৩০২ নম্বর কক্ষে রিয়াজ উদ্দিন ওরফে রাজুর সঙ্গে অবস্থান করেন তাজমিন। হোটেলের নিবন্ধন খাতায় তাজমিনের নাম ‘তানজু আক্তার’ এবং বয়স ১৮ বছর উল্লেখ করে তাকে রিয়াজের স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়। পরদিন ৭ অক্টোবর বেলা ১১টার দিকে হোটেল ত্যাগ করার পর রিয়াজ তাজমিনকে কুমিল্লাগামী বাসে তুলে দেন।
তাজমিনের কক্সবাজারে অবস্থানের বিষয়টি হোটেলের রেজিস্টার খাতা, সিসিটিভি ফুটেজ এবং রিয়াজের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত করা গেছে।
এরপর কুমিল্লায় রাতে বাস থেকে নেমে বাড়ি ফেরার পথে সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক সুমন মিয়ার হাতে ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হন তাজমিন। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে দায়ের করা হত্যা মামলায় অভিযুক্ত সুমন মিয়াকে (৩৫) চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
হোটেলের রেজিস্টারে স্ত্রী পরিচয়
কক্সবাজারের কলাতলীতে কুটুমবাড়ি-সংলগ্ন সড়কের শেষ মাথায় অবস্থিত তিনতলা আবাসিক হোটেলটির রেজিস্টার অনুযায়ী, গত ৬ অক্টোবর সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিটে রিয়াজ উদ্দিন ওরফে রাজুর সঙ্গে স্ত্রী পরিচয়ে ৩০২ নম্বর কক্ষটি ভাড়া নেন তাজমিন। সিসিটিভি ফুটেজেও তাদের হোটেলে প্রবেশ করতে দেখা গেছে। রেজিস্টারে তার নাম লেখা হয় ‘তানজু আক্তার’ এবং বয়স উল্লেখ করা হয় ১৮ বছর। সেখানে রিয়াজের পরিচয় দেওয়া হয়েছে বান্দরবানের লামা এলাকার মনির আহমদের ছেলে হিসেবে।
হোটেলের রেজিস্টারে রিয়াজের দুটি মুঠোফোন নম্বর এবং একটি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নম্বর লেখা ছিল। এর মধ্যে একটি নম্বর পরিবারের যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করা হয়। হোটেলটির এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এক রাত অবস্থান করার পর ৭ অক্টোবর বেলা ১১টার দিকে তারা হোটেল ছেড়ে চলে যান।
মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করে ঘর থেকে বের হয়ে যান তাজমিন
গত ৪ অক্টোবর এক বান্ধবীকে হাতঘড়ি দেওয়া নিয়ে মায়ের সঙ্গে তাজমিনের ঝগড়া হয়। এরপর তিনি বাড়ি থেকে বের হয়ে প্রথমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক বান্ধবীর কাছে যান। সেখান থেকে তিনি মুঠোফোনে রিয়াজের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তখন রিয়াজ তাকে কক্সবাজারে আসার জন্য বিকাশের মাধ্যমে ৫০০ টাকা পাঠান।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজুর এক সহকর্মী মুক্তকণ্ঠকে জানান, ফেসবুকের মাধ্যমে ১৭ দিন আগে তাজমিনের সঙ্গে রিয়াজের প্রথম পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। এরপর তাজমিন কক্সবাজারে আসেন। ঘোরাফেরা শেষ করে ৭ অক্টোবর রিয়াজ ‘আইকনিক এক্সপ্রেস’ বাসের টিকিট কেটে তাজমিনকে বাসে তুলে দেন। রিয়াজের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাজমিনের বাসের টিকিটের দাম ছিল ৯০০ টাকা।
রিয়াজের সহকর্মীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কুমিল্লায় ফেরার পথে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠার পরও রিয়াজের সঙ্গে তাজমিনের মুঠোফোনে কথা হচ্ছিল। অটোরিকশাচালকের বিস্তারিত তথ্যও তাজমিন রিয়াজকে জানিয়েছিলেন। তবে রাত দেড়টার দিকে তাজমিনের মুঠোফোনের লাইভ লোকেশন বন্ধ হয়ে গেলে তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। পরদিন বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে তাজমিনের ধর্ষণ ও হত্যার খবর দেখে স্তম্ভিত হয়ে পড়েন রিয়াজ।
ঘটনার পর থেকে রিয়াজ উদ্দিন ওরফে রাজুর মুঠোফোন বন্ধ থাকায় তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “মুঠোফোনের কললিস্টসহ অন্যান্য বিষয় নিয়ে তদন্ত চলছে। আসামি অটোরিকশা চালক হত্যার কথা স্বীকার করেছে। তদন্ত শেষ হলে বাকি সবকিছু জানা যাবে।”