কুমিল্লার লালমাই উপজেলায় স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিনকে (১৫) ধর্ষণ ও নৃশংসভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। অটোরিকশায় ওঠার পর গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই চালক সুমন মিয়াকে নিজের ব্যাগ থেকে ১০০ টাকা দিয়ে রুটি ও কলা কিনে আনতে বলেছিলেন তাজমিন। এরপরই তাকে ‘সংক্ষিপ্ত পথে’ পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে ভুল পথে নির্জন এলাকায় নিয়ে যায় সুমন। সেখানেই শিশুটিকে ধর্ষণ ও অত্যন্ত নৃশংসভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়।
শনিবার (১০ অক্টোবর) কুমিল্লার পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে অভিযুক্ত সুমন মিয়ার দেওয়া জবানবন্দির বরাত দিয়ে এসব তথ্য জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পঙ্কজ বড়ুয়া।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৮ অক্টোবর রাত সাড়ে ১২টার দিকে তাজমিন পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকার তিশা বাস কাউন্টারের সামনে থেকে রেসকোর্সের বাসায় যাওয়ার জন্য একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করেন। চালক সুমন মিয়ার সঙ্গে ৩০০ টাকা ভাড়ার কথা চূড়ান্ত হয়।
অটোরিকশায় ওঠার পর কিছু দূর যাওয়ার পর তাজমিনের দেওয়া ১০০ টাকা দিয়ে কলা ও রুটি কিনেছিলেন সুমন। এরপর তাকে শর্টকাটে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে নূরজাহান হোটেলের সামনে থেকে ইউটার্ন নিয়ে চাঁদপুরগামী সড়ক ধরে বিজরা বাজার হয়ে নির্জন এলাকার দিকে নিয়ে যান তিনি।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্জন ও অন্ধকার স্থানে পৌঁছে সুমন অটোরিকশাটি থামিয়ে দেন। জায়গাটি রেসকোর্স এলাকা নয় বুঝতে পেরে তাজমিন আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং অটোরিকশা থেকে নেমে পালানোর চেষ্টা করেন। এ সময় সুমন তাকে আটকে দিয়ে অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার চেষ্টা করলে তাজমিন চিৎকার শুরু করেন।
পুলিশের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদকালে সুমন তাজমিনকে ধর্ষণের কথা স্বীকার করেছেন। একপর্যায়ে তিনি একটি গামছা তাজমিনের গলায় পেঁচিয়ে ধরেন। ধস্তাধস্তির পর তাজমিন দুর্বল হয়ে পড়লে তাকে ধানক্ষেতে নিয়ে উপুড় করে শুইয়ে মাথা ও পা দিয়ে চেপে ধরে মৃত্যু নিশ্চিত করার কথা জানান অভিযুক্ত সুমন। তাজমিনের মৃত্যু নিশ্চিত করার পর তার হ্যান্ডব্যাগ থেকে আইফোনটি নিয়ে নেন তিনি। পরে ব্যাগটি ধানক্ষেতেই ফেলে রেখে ঘটনাস্থলে নিজের অটোরিকশাটি রেখে কাচিকাটা মসজিদের সামনে যান। সেখানে একটি পুকুরে গোসল করে অন্য একটি ভাড়ায় চালিত সিএনজিতে করে বাখরাবাদ এলাকায় পৌঁছান তিনি।
বাখরাবাদ এলাকার একটি পুকুরপাড়ের জঙ্গলে তাজমিনের আইফোনটি লুকিয়ে রেখে তিনি চট্টগ্রামে চলে যান। পরদিন ৯ অক্টোবর চট্টগ্রাম থেকে সুমনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরবর্তীতে তার দেওয়া তথ্য ও দেখানো মতে বাখরাবাদ এলাকার ওই জঙ্গল থেকে তাজমিনের ব্যবহৃত আইফোনটি উদ্ধার করা হয়।
গত ৮ অক্টোবর সকালে লালমাই উপজেলার ভোরাজগৎপুর উত্তরপাড়া গ্রামের একটি ধানক্ষেতের আইলের পাশে তাজমিনের মরদেহ পড়ে থাকার খবর জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ আসে। খবর পেয়ে লালমাই থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার ও পরিচয় শনাক্তের কার্যক্রম শুরু করে। পরে তার বাবা মরদেহটি শনাক্ত করেন।
তাজমিন কুমিল্লা নগরীর ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন। তার স্থায়ী বাড়ি যশোর জেলায়। বাবার চাকরির সুবাদে পরিবারের সঙ্গে কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকায় বসবাস করতেন তিনি। এই নারকীয় ঘটনায় লালমাই থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলা হওয়ার পর জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও থানা পুলিশ যৌথভাবে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে।