কুমিল্লার সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন (১৫) হত্যা মামলার তদন্তে বড় অগ্রগতি হয়েছে। এই ঘটনার সাথে জড়িত থাকার সন্দেহে তার কথিত প্রেমিক রিয়াজ উদ্দিন ওরফে রাজুকে আটক করেছে পুলিশ। রোববার (১১ অক্টোবর) রাত সাড়ে ১০টার দিকে কক্সবাজার শহরের কলাতলী এলাকায় এক বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
কক্সবাজার সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী রাজুকে আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, তাজমিন হত্যা মামলার তদন্ত চলাকালীন তথ্যপ্রযুক্তির বিশেষ সহায়তা এবং নিবিড় অনুসন্ধানের মাধ্যমে রাজুর সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যায়। এরপর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাদের সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে তাকে আটক করা সম্ভব হয়।
তদন্তকারী পুলিশ জানিয়েছে, কলাতলী এলাকার একটি হোটেলে কর্মরত রাজু আটকের পর পুলিশকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। এই তথ্যাদি মামলার রহস্য উদঘাটনে এবং তদন্ত প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অভিযান) মো. অহিদুর রহমান বলেন, “রাজুকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়েছে। মূল ঘটনার সঙ্গে কক্সবাজারে আসার কোনো সম্পৃক্ততা আছে কি না, তা যাচাই-বাছাই করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
আটক রাজুকে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে জানিয়ে অহিদুর রহমান বলেন, “মূল ঘটনার সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কিনা, তা যাচাই-বাছাই করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে বেশ কিছু তথ্য দিয়েছে যা তদন্তকে এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে।” তবে তদন্তের গোপনীয়তা বজায় রাখতে তিনি বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করতে রাজি হননি।
তিনি আরও জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রাজু স্বীকার করেছে যে তাজমিন তার কাছে এসেছিলেন এবং এক রাত তার সাথে ছিলেন। পরদিন তাকে গাড়িতে তুলে দিয়েছিলেন বলেও রাজু দাবি করেছে। রাজুর ভাষ্য অনুযায়ী, ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে তাদের পরিচয় হয় এবং প্রায় তিন মাস ধরে তাদের মধ্যে যোগাযোগ ছিল। সেই সম্পর্কের সূত্র ধরেই তাজমিন কক্সবাজারে এসেছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরও জানান, রাজুর বিষয়ে এখন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেবেন। কুমিল্লা থেকে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কক্সবাজারে এলে তাকে তাদের হাতে হস্তান্তর করা হবে। অন্যথায় প্রচলিত আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তদন্ত চলাকালীন কক্সবাজারের ওই হোটেলের রেজিস্টার খাতা, সিসিটিভি ফুটেজ এবং রিয়াজের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের দেওয়া বক্তব্যের মাধ্যমে তাজমিনের সেখানে অবস্থানের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
কক্সবাজারের কলাতলীতে কুটুমবাড়ি সংলগ্ন সড়কের শেষ প্রান্তে অবস্থিত একটি তিন তলা আবাসিক হোটেলের রেজিস্টারে দেখা গেছে, গত ৬ অক্টোবর সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিটে রিয়াজ উদ্দিন ওরফে রাজু তার স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিয়ে তাজমিনকে নিয়ে ৩০২ নম্বর কক্ষ ভাড়া নেন। তবে রেজিস্টারে তাজমিনের নাম লেখা হয় ‘তানজু আক্তার’ এবং বয়স ১৮ বছর। সেখানে রিয়াজের পরিচয় দেওয়া হয় লামা এলাকার মনির আহমদের ছেলে হিসেবে।
অনুসন্ধানে আরও বেরিয়ে এসেছে, তিন মাস আগে ইনস্টাগ্রামে তাজমিনের সাথে রিয়াজের পরিচয় হয় এবং এরপর থেকে তাদের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। গত ৪ অক্টোবর একটি হাতঘড়ি বান্ধবীকে দেওয়া নিয়ে মায়ের সাথে তাজমিনের ঝগড়া হয়। এই ঘটনার পর তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রথমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক বান্ধবীর কাছে যান। সেখান থেকে রিয়াজের সাথে মুঠোফোনে কথা বলেন। রিয়াজ তাকে কক্সবাজারে আসার জন্য বিকাশের মাধ্যমে ৫০০ টাকা পাঠান।
জানা গেছে, তাজমিন কুমিল্লায় ফিরে সিএনজিতে ওঠার পরও রিয়াজের সাথে ফোনে কথা বলছিলেন। এমনকি তিনি সিএনজি চালকের বিস্তারিত তথ্যও রিয়াজকে জানিয়েছিলেন। রাত দেড়টার দিকে তাজমিনের লাইভ লোকেশন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তার সাথে আর কোনো যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। পরদিন বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে তাজমিনের ধর্ষণ ও হত্যার খবর দেখে রিয়াজ বিস্তারিত জানতে পারেন বলে জানা গেছে।
এর আগে রোববার সন্ধ্যায় গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই কথিত প্রেমিক রাজু তাজমিনের বিষয়ে কিছু চাঞ্চল্যকর দাবি করেন। তার দাবি, রাতে তাজমিন কুমিল্লা শহরের বাসায় গিয়ে প্রধান ফটক বন্ধ দেখতে পান। এরপর মা-বাবাকে ফোন করেও কোনো সাড়া না পেয়ে বিষয়টি তাকে জানান।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাসায় ঢুকতে না পেরে তাজমিন পরে এক বন্ধুর সাথে যোগাযোগ করেন। সকালে বাসায় ফিরে যাওয়ার কথা জানালে রাজু তাকে ভিডিও কল করেন এবং তখন তাজমিনকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় দেখতে পান। পরে এই বিষয় নিয়ে তিনি তাজমিনকে বকাঝকা করেছিলেন বলে দাবি করেন ওই ব্যক্তি।