রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে সম্প্রতি এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি 'চ্যালেঞ্জড শিক্ষার্থী সম্মেলন' আয়োজন করেছে গণসাক্ষরতা অভিযান। এই সম্মেলনে বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শিক্ষার্থীরা তাদের ব্যক্তিগত সমস্যা এবং মানসিক যাতনার কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরে।
বরিশাল থেকে আসা ছাত্রী সিনথিয়া আক্তার মনি জানান, পরীক্ষার সময় টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল। অসুস্থতার কারণে গণিত বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিতে পারেননি তিনি, যার ফলে ওই বিষয়ে অকৃতকার্য হতে হয়। অথচ বাকি সব বিষয়ে তিনি জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন। নিজের এই করুণ পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে একপর্যায়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন ওই ছাত্রী।
অন্যদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে আসা আরেক ছাত্রী জানান, পদার্থবিজ্ঞান ছাড়া অন্য সব বিষয়ে তিনি ভালো নম্বর পেয়েছেন। অধিকাংশ বিষয়ে তার প্রাপ্ত ফলাফল এ প্লাস, এ বা এ মাইনাস। কিন্তু শুধুমাত্র পদার্থবিজ্ঞানে অকৃতকার্য হওয়ার কারণে বন্ধুদের তুলনায় তাকে এক বছর পিছিয়ে পড়তে হচ্ছে। তিনি দাবি জানান, অকৃতকার্য বিষয়ে তিন মাসের মধ্যে পুনরায় পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হোক। কারণ, পুনরায় সুযোগ পেলে তিনি পাস করার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সর্বশেষ এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ৬ লাখ ৯০ হাজার শিক্ষার্থী এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, এসএসসি বা এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষায় কোনো শিক্ষার্থী এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হলে তাকে পরবর্তী বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। তখন সে শুধু অকৃতকার্য বিষয়গুলোতে অথবা চাইলে সব বিষয়ে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পায়। কিন্তু মাত্র একটি বা দুটি বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার কারণে দীর্ঘ এক বছর অপেক্ষা করা শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনে পিছিয়ে পড়ার পাশাপাশি তীব্র মানসিক চাপের সৃষ্টি করে।
এই বাস্তবতায় পরীক্ষার্থী, অভিভাবক এবং শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দাবি জানাচ্ছেন যেন ফল প্রকাশের তিন মাসের মধ্যে অকৃতকার্য বিষয়ে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। সরকারও এই দাবিটিকে ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করছে।
শিক্ষাবিদ এবং শিক্ষা বোর্ডের বর্তমান ও সাবেক চেয়ারম্যানদের মতে, এই ব্যবস্থা চালু হলে শিক্ষার্থীদের ব্যাপক উপকার হবে। সরকারের পক্ষ থেকে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে শিক্ষা বোর্ডগুলোর পক্ষে এই পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব, কারণ প্রয়োজনীয় সক্ষমতা তাদের রয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের এক বছর অপেক্ষা করতে হবে না এবং নিয়মিত ও অনিয়মিত পরীক্ষার্থীদের একসঙ্গে পরীক্ষা নেওয়া ও প্রশ্নপত্র বিতরণ সংক্রান্ত জটিলতাও হ্রাস পাবে।
উল্লেখ্য, গত ১০ আগস্ট এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। এবার ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার কমে ৬৪ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা গত ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। আর সাধারণ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ড মিলিয়ে গড় পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ।
ফলাফল প্রকাশের পর পুনর্নিরীক্ষণ ও পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর ফলাফল পরিবর্তিত হয়েছে। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে নতুন করে ৩ হাজার ৭৯ জন জিপিএ-৫ পেয়েছেন। প্রথমবার অকৃতকার্য হওয়া পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ৪ হাজার ৫৮৫ জন পরে উত্তীর্ণ হয়েছেন, যা গতবারের ২ হাজার ২০৭ জনের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
এই পরিস্থিতিতে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের দ্রুত পুনরায় পরীক্ষা দেওয়ার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা এবং শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানিয়েছেন, এসএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষায় এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীরা যাতে এক বছর অপেক্ষা না করে তিন মাসের মধ্যে শুধু অকৃতকার্য বিষয়গুলোতে পরীক্ষা দিতে পারে, সেই সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হবে। গতকাল শনিবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে তিনি সরকারের এই পরিকল্পনার কথা জানান।
সরকারের এই ভাবনা অনুযায়ী, স্বল্প সময়ের মধ্যে কীভাবে পরীক্ষা নেওয়া যায়, তা নিয়ে পরিকল্পনা করছে শিক্ষা বোর্ডগুলো। সব শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানদের সংগঠন আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান আজ রোববার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "যারা ফেল করবে, তাদের জন্য স্বল্প সময়ের মধ্যে কী করা যায়, এ বিষয়ে আগামীকাল সোমবার একটি সভা ডাকা হয়েছে।" তিনি আরও জানান, ওই সভায় বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা করা হবে।
তবে এ বছরই এই ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে কি না, সে বিষয়ে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছেন না অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান। তিনি বলেন, "পরীক্ষা নিতে হলে তিন মাস আগেই প্রশ্নপত্র তৈরি করে রাখতে হয়। তবে পরিকল্পনাটি এখন চূড়ান্ত করে রাখলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করা যাবে।" এর ফলে প্রথমবার অকৃতকার্য শিক্ষার্থীরা অন্যদের সঙ্গে একই শিক্ষাবর্ষে ভর্তির সুযোগ পাবে এবং পাঠ্যসূচির দ্বৈততা এড়ানো সম্ভব হবে। তিনি এই পরিকল্পনাকে শতভাগ ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।
তবে শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, এই ধরনের পরীক্ষা চালু করতে হলে নীতিগত সিদ্ধান্তের পাশাপাশি পরীক্ষার সময়সূচি এবং প্রশ্নপত্র ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। এক্ষেত্রে শিক্ষা বোর্ডগুলোর সক্ষমতা যাচাই করা প্রয়োজন।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান তপন কুমার সরকার মুক্তকণ্ঠকে জানান, বর্তমানে পাবলিক পরীক্ষায় এমন কোনো নিয়ম নেই। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় নীতিমালা করে দিলে এই ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব। তিনি বলেন, "এতে পরীক্ষার্থীরা এক বছর অপেক্ষা না করে দ্রুত পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পাবে। একটি বিষয়ের জন্যই শিক্ষার্থীদের জীবনের একটি বছর চলে যায়।"
তপন কুমার সরকারের মতে, তিন মাসের মধ্যে পরীক্ষা নেওয়া গেলে শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ কমবে। তিনি বলেন, "এতে বোর্ডের কাজের চাপ বাড়লেও পরীক্ষা নেওয়ার সক্ষমতা তাদের রয়েছে। কারণ, এ ধরনের পরীক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক কম। তা ছাড়া, অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই এসব বিষয়ের পরীক্ষা শেষ করা সম্ভব। এটি মূলত নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের বিষয়। সিদ্ধান্ত হলে পরীক্ষা নিতে কোনো সমস্যা হবে না। প্রয়োজনীয় জনবল ও ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বোর্ডের রয়েছে। এ ব্যবস্থা পরীক্ষার্থী ও অভিভাবক—উভয়ের জন্যই ভালো হবে।"
শিক্ষাবিদ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদও মনে করেন, অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের দ্রুত পুনরায় পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা উচিত। বর্তমান মূল্যায়ন পদ্ধতির নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন থাকায় পরীক্ষার্থীদের যতটা সম্ভব সুযোগ দেওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন। অধ্যাপক মনজুর আহমদ বলেন, "একটি বিষয়ে ফেল করলে দ্রুত সেই বিষয়ের পরীক্ষা নেওয়া গেলে তা ভালো উদ্যোগ হবে। শিক্ষার্থীদের দিক বিবেচনা করে সরকার তা চালু করতে পারে।"