এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্য ফল প্রকাশের তিন মাসের মধ্যেই পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার একটি উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ এক বছর অপেক্ষা না করেই তাদের অকৃতকার্য বিষয়গুলোতে পুনরায় পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পেতে পারে। শিক্ষা বোর্ডগুলো শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে যে, চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা কার্যকর করা সম্ভব। তবে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ক্ষেত্রে এ বছরই এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয় বলে মত দিয়েছে বোর্ডগুলো; আগামী বছর থেকে এই সুযোগ চালু করা যেতে পারে বলে তারা মনে করছে।
আজ সোমবার মন্ত্রণালয়কে তাদের মতামত প্রদান করেছে শিক্ষা বোর্ডগুলো। এখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব মন্ত্রণালয়ের। আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান আজ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “বোর্ডগুলো তিন মাসের মধ্যে পরীক্ষা নিতে প্রস্তুত আছে। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়কে মতামত দেওয়া হয়েছে। এখন পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে মন্ত্রণালয়।” তিনি আরও জানান, এ বছরই এইচএসসি পরীক্ষার ক্ষেত্রে তিন মাসের মধ্যে পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব।
অন্যদিকে, শিক্ষা বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে মুক্তকণ্ঠকে জানান, কয়টি বিষয়ে অকৃতকার্য হলে এই বিশেষ পরীক্ষা নেওয়া হবে এবং উচ্চশিক্ষায় ভর্তির প্রক্রিয়াগুলো কীভাবে সামলানো হবে, তা নিয়ে আরও গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে। তাই এই মুহূর্তে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত জানানো সম্ভব হচ্ছে না।
বর্তমানে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, এসএসসি বা এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষায় একজন শিক্ষার্থী এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হলে তাকে পরবর্তী বছরের পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। তখন সে চাইলে শুধু অকৃতকার্য বিষয়ে অথবা সব বিষয়েই পরীক্ষা দিতে পারে। কিন্তু মাত্র একটি বা দুটি বিষয়ে ফেল করার কারণে পুরো এক বছর পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বড় ধরনের মানসিক চাপ ও শিক্ষাজীবনে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এই সংকট নিরসনে পরীক্ষার্থী, অভিভাবক এবং শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে ফল প্রকাশের তিন মাসের মধ্যে পুনরায় পরীক্ষার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। গত শনিবার রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে গণসাক্ষরতা অভিযানের আয়োজনে ‘চ্যালেঞ্জড শিক্ষার্থী সম্মেলন’ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা অকৃতকার্য শিক্ষার্থীরা তাদের কষ্টের কথা ও সমস্যার কথা তুলে ধরেন এবং তিন মাসের মধ্যে পুনরায় পরীক্ষার দাবি জানান।
শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের মতে, একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়ে গেলে এই ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব হবে, যা শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ অপেক্ষা এবং মানসিক চাপের ঝুঁকি কমিয়ে আনবে। সরকারও এই দাবিটিকে ইতিবাচকভাবে দেখছে। ওই অনুষ্ঠানেই প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, “এসএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষায় এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীরা যাতে এক বছর অপেক্ষা না করে তিন মাসের মধ্যে শুধু অকৃতকার্য বিষয়গুলোতে আবার পরীক্ষা দিতে পারে, সেই সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হবে।” তবে তিনি উল্লেখ করেন, এসএসসিতে এবারই হয়তো এ ব্যবস্থা চালু করা কঠিন হতে পারে।
শিক্ষাবিদ এবং শিক্ষা বোর্ডের বর্তমান ও সাবেক চেয়ারম্যানদের মতে, সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে বোর্ডগুলোর পক্ষে এই পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব। এতে নিয়মিত ও অনিয়মিত পরীক্ষার্থীদের একসঙ্গে পরীক্ষা নেওয়ার ঝামেলা কমবে এবং প্রশ্নপত্র তৈরি ও বিতরণের জটিলতা হ্রাস পাবে।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান তপন কুমার সরকার গতকাল রোববার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “বর্তমানে পাবলিক পরীক্ষায় এ ধরনের নিয়ম নেই। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় নীতিমালা করে দিলে এ ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব। এতে পরীক্ষার্থীরা এক বছর অপেক্ষা না করে দ্রুত পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পাবে। একটি বিষয়ের জন্যই শিক্ষার্থীদের জীবনের একটি বছর চলে যায়।”
তিনি আরও মনে করেন, তিন মাসের মধ্যে পরীক্ষা নেওয়া গেলে শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ কমবে। তিনি বলেন, এতে বোর্ডের কাজের চাপ বাড়লেও পরীক্ষা নেওয়ার সক্ষমতা তাঁদের রয়েছে। কারণ, এ ধরনের পরীক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক কম এবং অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই এসব বিষয়ের পরীক্ষা শেষ করা সম্ভব। এটি মূলত নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের বিষয়। সিদ্ধান্ত হলে পরীক্ষা নিতে কোনো সমস্যা হবে না। প্রয়োজনীয় জনবল ও ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বোর্ডগুলোর রয়েছে। এ ব্যবস্থা পরীক্ষার্থী ও অভিভাবক—উভয়ের জন্যই ভালো হবে।
তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ৬ লাখ ৯০ হাজার শিক্ষার্থী এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে। গত ১০ আগস্ট এই পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয় এবং ইতিমধ্যে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির পর ক্লাসও শুরু হয়ে গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে এ বছর এসএসসির ক্ষেত্রে এই সুযোগ দেওয়া খুবই কঠিন, কারণ আগে থেকে পরিকল্পনা থাকলে তা সম্ভব হতো।
তবে এ বছর এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ক্ষেত্রে এটি কার্যকর হতে পারে। গত জুলাই মাসে শুরু হওয়া এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় নিয়মিত ও অনিয়মিত মিলিয়ে মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন। শিক্ষা বোর্ডগুলো আগামী ২৫ থেকে ২৯ অক্টোবরের মধ্যে যেকোনো একদিনে ফলাফল প্রকাশের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছে।
শিক্ষাবিদ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদও অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের দ্রুত পুনরায় পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ তৈরির পক্ষে মত দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, বর্তমান মূল্যায়ন পদ্ধতি কতটা নির্ভরযোগ্য, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, তাই শিক্ষার্থীদের যতটা সম্ভব সুযোগ দেওয়া উচিত। অধ্যাপক মনজুর আহমদ গতকাল রোববার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “একটি বিষয়ে ফেল করলে দ্রুত সেই বিষয়ের পরীক্ষা নেওয়া গেলে তা ভালো উদ্যোগ হবে। শিক্ষার্থীদের দিক বিবেচনা করে সরকার তা চালু করতে পারে।”