বাইরে থেকে দেখে বোঝার কোনো উপায় ছিল না, তবে ভেতরে চলছিল মারাত্মক এক কারসাজি। জেলি, সয়াবিন তেল, পাম অয়েল এবং হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের মতো অত্যন্ত ক্ষতিকর রাসায়নিক মিশিয়ে অভিনব উপায়ে তৈরি করা হচ্ছিল ভেজাল দুধ। পাবনার ফরিদপুর উপজেলার পুরেন্দরপুর উত্তরপাড়া এলাকায় এমন একটি অসাধু চক্রের সন্ধান পায় উপজেলা প্রশাসন ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। এরপর অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ছদ্মবেশে অভিযান চালিয়ে দুটি প্রতিষ্ঠানকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। পাশাপাশি একজনকে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং একটি ডেইরি ফার্ম সিলগালা করা হয়েছে।

গত শনিবার (১০ অক্টোবর) রাতে উপজেলার পুরেন্দরপুর উত্তরপাড়া এলাকায় এই বিশেষ অভিযানটি পরিচালিত হয়।

অভিযান সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পুরেন্দরপুর উত্তরপাড়া এলাকায় দীর্ঘ দিন ধরে জেলি, সয়াবিন তেল ও বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে ভেজাল দুধ উৎপাদন ও তা বাজারজাত করার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছিল। তবে প্রশাসনের অভিযানের কথা জানতে পারলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দ্রুত সতর্ক হয়ে যেতেন, যার ফলে তাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছিল। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবার ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। শনিবার বিকেলে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা এবং স্বাস্থ্যসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার ছদ্মবেশে ওই এলাকায় প্রবেশ করেন অভিযানে অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা। এরপর রাতে যখন ভেজাল দুধ তৈরির কার্যক্রম শুরু হয়, ঠিক তখনই অতর্কিত অভিযান চালিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হাতেনাতে ধরা হয়।

অভিযান চলাকালীন পুরেন্দরপুর উত্তরপাড়ার শামীম হোসেন নামের এক ব্যবসায়ীর দুধে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড মেশানোর প্রমাণ পাওয়া যায়। তল্লাশির সময় তার কাছ থেকে ১০০ গ্রাম হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড উদ্ধার করা হয়। এই অপরাধের দায়ে তাকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

অন্যদিকে, ‘স্বপ্ন ডেইরি ফার্ম’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে জেলি, সয়াবিন তেল এবং ব্লেন্ডার মেশিন ব্যবহার করে নকল দুধ তৈরির কার্যক্রম চলছিল। বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনকে অবহিত করা হলে দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন ফরিদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উম্মে ইমামা বানীন। সেখানে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে প্রতিষ্ঠানটিকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এই ঘটনার সাথে জড়িত একজনকে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং প্রতিষ্ঠানটি সাময়িকভাবে সিলগালা করা হয়। এছাড়া ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা দুই ড্রাম জেলি ও এক ড্রাম পাম অয়েল ধ্বংস করা হয়।

ফরিদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে ইমামা বানীন বলেন, “ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের তথ্যের ভিত্তিতে রাতে স্বপ্ন ডেইরি ফার্মে অভিযান চালানো হয়। সেখানে ক্ষতিকর রাসায়নিক ও অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার করে ভেজাল দুধ উৎপাদনের প্রমাণ পাওয়া যায়। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটিকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ও একজনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।”

পাবনা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মাহমুদ হাসান রনি বলেন, “ভেজাল দুধ উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত চক্রটি বেশ সতর্ক। এলাকায় ম্যাজিস্ট্রেট প্রবেশের খবর পেলেই তারা উৎপাদন কার্যক্রম গুটিয়ে ফেলে এবং সতর্ক হয়ে যায়। ফলে তাদের হাতেনাতে ধরা কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে এবার ছদ্মবেশে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।”