সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার ২৪২টি পদের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে শেষ মুহূর্তে পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ করেছেন তিন লাখের বেশি চাকরিপ্রার্থী।
গতকাল শনিবার রাজধানীর ৯৫টি কেন্দ্রে বেলা ১১টায় এই প্রিলিমিনারি বা বাছাই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। ২৪২টি পদের বিপরীতে আবেদন করেছিলেন প্রায় ৩ লাখ ১৯ হাজার প্রার্থী। অনেক প্রার্থীই দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকায় এসেছিলেন। পরীক্ষার হলে নিজ নিজ আসনে বসেছিলেন প্রার্থীরা এবং অনেক কেন্দ্রে উত্তরপত্র বা ওএমআর শিটও বিতরণ করা হয়েছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে তাঁরা জানতে পারেন যে পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের আলোচনার প্রেক্ষিতেই যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর শেষ মুহূর্তে এই সিদ্ধান্ত নেয়।
পরীক্ষা স্থগিত হওয়ায় চরম ভোগান্তির মুখে পড়েছেন প্রার্থীরা। যাতায়াত ও থাকার খরচের পাশাপাশি তাঁদের দীর্ঘদিনের প্রস্তুতিও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষুব্ধ প্রার্থীরা রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে অবস্থান নিয়ে প্রতিবাদ জানান।
যশোরের এম এম কলেজ থেকে পরীক্ষা দিতে আসা ফারিয়া ফেরদৌস কারওয়ান বাজার মেট্রোস্টেশনে মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, “অনেক কষ্টে সকালে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছেছিলেন। নির্ধারিত সময়ে তাঁদের ওএমআর শিট বা উত্তরপত্র দেওয়া হয়। এর দুই মিনিটের মাথায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কক্ষে এসে পরীক্ষা স্থগিতের কথা জানান।”
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, পরীক্ষা নেওয়ার যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছিল। তবে পরীক্ষা শুরুর ঠিক আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি নজরে আসায় তা স্থগিত করা হয়। এই অভিযোগ তদন্তে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে এবং তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, স্থগিত হওয়া পরীক্ষাটি প্রাথমিকভাবে ১৬ অক্টোবর শুক্রবার বেলা তিনটায় নেওয়ার তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। এই বিষয়ে পরীক্ষার্থীদের পুনরায় এসএমএসের মাধ্যমে অবহিত করা হবে।
নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রার্থীরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন চাকরি প্রার্থী বলেন, “দেশে সরকারি চাকরির সুযোগ সীমিত। এরই মধ্যে নিয়োগ পরীক্ষা শেষ মুহূর্তে স্থগিত হওয়ায় সরকারি নিয়োগপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। পরীক্ষার আগেই কীভাবে প্রশ্নপত্র ছড়িয়ে পড়ল এবং তা ঠেকাতে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কোথায় ঘাটতি ছিল, তদন্তে এসবের উত্তর পাওয়া জরুরি। প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শেষ মুহূর্তে পরীক্ষা স্থগিত হওয়ার মতো ঘটনা চাকরিপ্রার্থীদের ভোগান্তি বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়োগব্যবস্থার ওপর তাঁদের আস্থাও দুর্বল করে।”
দেশের শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের উচ্চ হার নিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এক প্রতিবেদনে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। আইএমএফের ফিন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ম্যাগাজিনের সেপ্টেম্বর সংস্করণে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি ১০০ জন শিক্ষিত তরুণের মধ্যে ৩৬ জন বেকার। উচ্চশিক্ষা শেষ করেও বিপুলসংখ্যক তরুণ বর্তমানে বেকার হয়ে আছেন।
গতকাল এই পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে রাজধানীর মেট্রোস্টেশনগুলোতে ব্যাপক ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, আগারগাঁও, কাজীপাড়া ও শেওড়াপাড়া স্টেশনে যাত্রীদের চাপ ছিল চোখে পড়ার মতো। বেলা ১১টার পর বেইলি রোড এলাকায় শত শত চাকরিপ্রার্থীকে কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে আসতে দেখা যায়।
রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষা দিতে আসা সিলেটের এক প্রার্থী মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, “পরীক্ষা শুরুর মিনিটখানেক আগে পরীক্ষা বাতিলের কথা জানানো হয়। তাঁরা শুনেছেন, প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে।”
রংপুরের আরেক নারী প্রার্থী জানান, প্রশ্নপত্র দেওয়ার সময় শিক্ষকেরা এসে জানান যে প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।
ঢাকার একটি কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করা একজন শিক্ষক মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, “পরীক্ষা শুরুর আগমুহূর্তে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি জানাজানি হলে পরীক্ষা স্থগিত করা হয়।”
এই ঘটনার প্রতিবাদে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, শাহবাগ, মতিঝিল, নীলক্ষেত মোড় ও সাতমসজিদ সড়কে অবস্থান নেন পরীক্ষার্থীরা। বেলা সোয়া ১১টা থেকে দুপুর ১২টার দিকে এই অবরোধ শুরু হয় এবং বেলা দুইটা পর্যন্ত শাহবাগে অবরোধ চলার কারণে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। ক্ষুব্ধ প্রার্থীরা এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দাবি করছেন।
সরকারি চাকরির প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য প্রার্থীরা দীর্ঘ সময় ধরে প্রস্তুতি নেন। দূরবর্তী জেলা থেকে আসা প্রার্থীদের জন্য যাতায়াত ও থাকার ব্যয় অনেক বেশি। শেষ মুহূর্তে পরীক্ষা স্থগিত হওয়ায় আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি মানসিক দুর্ভোগও বেড়েছে। অনেকে কর্মস্থল বা ব্যক্তিগত কাজ থেকে ছুটি নিয়ে এসেছিলেন, যাদের এখন নতুন তারিখে পুনরায় একই প্রস্তুতি ও ব্যয়ের সম্মুখীন হতে হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক প্রার্থী বলেন, “সরকারি চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্য ও সুযোগের অসমতা নিয়ে তরুণদের ক্ষোভ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রেক্ষাপট ছিল। সেই অভিজ্ঞতার পরও যদি নিয়োগ পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তাহলে তা তরুণদের মধ্যে হতাশা ও আস্থাহীনতা আরও বাড়াতে পারে।”
প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন। তারা জড়িতদের গ্রেপ্তার, ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ এবং দ্রুত নতুন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে। কোনো কোনো সংগঠন এই ঘটনাকে ‘বিএনপির রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যর্থতার প্রতিফলন’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন বিএনপির ছাত্রসংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল এই ঘটনাকে ‘অমার্জনীয় অপরাধ’ আখ্যা দিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছে।