একটি সরকারি চাকরির প্রত্যাশায় একজন প্রার্থীকে কতটা কঠোর পরিশ্রম করতে হয় এবং কতটা অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে তাকে পথ চলতে হয়, তা কেবল পরীক্ষার্থীরাই সবচেয়ে ভালো অনুধাবন করতে পারেন। অনেকের ক্ষেত্রে পরীক্ষার প্রস্তুতির পাশাপাশি থাকে দূরবর্তী জেলা থেকে রাজধানী ঢাকায় আসার বিপুল খরচ, থাকার জায়গার অনিশ্চয়তা এবং সেই সঙ্গে যুক্ত হয় পরিবারের প্রত্যাশা পূরণের এক প্রবল মানসিক চাপ।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিতে আসা প্রার্থীদের প্রস্তুতিও ছিল ঠিক তেমনই। ১১তম গ্রেডের এই পদের জন্য মোট শূন্য পদ ছিল ২৪২টি। আর প্রতিটি শূন্য পদের বিপরীতে আবেদন করেছিলেন ১ হাজার ২৬২ জন প্রার্থী। অর্থাৎ, বিপুল সংখ্যক তরুণ এই চাকরির প্রতিযোগিতায় নেমেছিলেন। কিন্তু পরীক্ষার দিন কেন্দ্রে পৌঁছে তাঁরা এক চরম ধাক্কা খেলেন; তাঁদের জানানো হলো, পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত পরীক্ষার আগের রাতে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র। পরবর্তীতে ছড়িয়ে পড়া সেই প্রশ্নপত্রের সঙ্গে মূল পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের মিল পাওয়া যায়, আর তখনই কর্তৃপক্ষ পরীক্ষা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয়।
তবে এখানে মূল প্রশ্ন কেবল প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়ে নয়। যাঁরা মাসের পর মাস কঠোর প্রস্তুতি নিয়ে, নিজেদের কষ্টার্জিত অর্থ ব্যয় করে পরীক্ষার কেন্দ্রে এসে পৌঁছেছিলেন, তাঁদের এই চরম ভোগান্তির দায়ভার কে গ্রহণ করবেন? যাঁদের দায়িত্ব ছিল প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং তাঁদের বিচারের আওতায় আনা, তাঁদের সেই ব্যর্থতার মূল্য কেন সাধারণ চাকরিপ্রার্থীদের দিতে হবে?
প্রতিবছর আমাদের দেশে আনুমানিক ২০ থেকে ২২ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশের কর্মসংস্থান হয় বিদেশে। আর বাকিদের জীবনসংগ্রাম চলে দেশের শ্রমবাজারের সুযোগের সন্ধানে। কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার কারণে সরকারি চাকরি অনেক তরুণের কাছে অত্যন্ত কাঙ্ক্ষিত হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৬ লাখ ২৪ হাজার। তবে কেবল এই পরিসংখ্যান দিয়ে কর্মসংস্থানের সামগ্রিক ও প্রকৃত চিত্র বোঝা সম্ভব নয়।
পরীক্ষা স্থগিতের পর এই পুরো বিষয়টি নিয়ে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের একজন পরিচালকের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি জানান, ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রের সঙ্গে পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের মিল পাওয়ায় পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। দূর-দূরান্ত থেকে ঢাকায় এসে কেন্দ্রে উপস্থিত হওয়া প্রার্থীদের চরম ভোগান্তির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি ‘দুর্ঘটনা’। দুর্ঘটনা ঘটলে সবাইকেই ভুগতে হয়।
এখানেই প্রশ্ন জাগে, এই দুর্ঘটনা কি চাকরিপ্রার্থীরা ঘটিয়েছেন? যাঁরা মাসের পর মাস প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা করেছেন, যাঁরা দূর-দূরান্ত থেকে কেন্দ্রে পৌঁছেছেন, তাঁরা কি প্রশ্নপত্র তৈরি করেছেন, ছাপিয়েছেন কিংবা বিতরণ করেছেন? অবশ্যই না। তাহলে অন্যের ব্যর্থতার দায় তাঁদের বহন করতে হবে কেন?
প্রশ্নপত্র তৈরি, মুদ্রণ, সংরক্ষণ ও বিতরণের প্রক্রিয়ার কোনো একটি পর্যায় থেকেই যে প্রশ্নপত্র বাইরে এসেছে, তা বুঝতে ‘রকেট সায়েন্টিস্ট’ হওয়ার প্রয়োজন নেই। কীভাবে প্রশ্নপত্র ফাঁস হলো, তা পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করে বের করতে হবে। এখানে কারও অবহেলা কিংবা কোনো গোপন যোগসাজশ ছিল কি না, সেটি খতিয়ে দেখা অত্যন্ত জরুরি।
একটি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মৌলিক দায়িত্ব। সেই নিরাপত্তাব্যবস্থা ব্যর্থ হলে পরীক্ষা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু পরীক্ষা স্থগিতের ফলে যে ভোগান্তি তৈরি হলো, তার দায় কি সবাইকে সমানভাবে নিতে হবে? যাঁরা কোনো অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নন, তাঁদের কেন সময়, অর্থ ও শ্রমের ক্ষতি মেনে নিতে হবে?
এই পরিস্থিতির জন্য কেবল ‘দুর্ঘটনা’ শব্দটি যথেষ্ট নয়। দুর্ঘটনা বললেই ঘটনার প্রকৃত কারণ ব্যাখ্যা হয়ে যায় না, আর দায়িত্ব থেকেও মুক্তি পাওয়া যায় না।
এর আগেও দেশে সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে বড় ধরনের অভিযোগ এবং তদন্তের ঘটনা সামনে এসেছে। এমনকি পিএসসির অধীন নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগও উঠে এসেছে। এসব ঘটনা থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের শিক্ষা নেওয়ার কথা ছিল। প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা আরও জোরদার করা, দায়িত্বের প্রতিটি স্তরে কঠোর নজরদারি এবং অনিয়মের ঝুঁকি কমানোর কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ছিল।
তা সত্ত্বেও যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষায় কেন এমন ঘটনা ঘটল? আগের প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাগুলোর পর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল? এবার সেই ব্যবস্থায় কোথায় ঘাটতি ছিল? দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মধ্যে কারও অবহেলা বা যোগসাজশ ছিল কি না? এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর দিতে হবে অধিদপ্তরকেই।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে পরীক্ষা স্থগিত করে কর্তৃপক্ষ হয়তো সাময়িকভাবে অন্যায্য প্রতিযোগিতা ঠেকিয়েছে। কিন্তু এতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের মূল উৎস বন্ধ হয়েছে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের এই নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত হওয়ার ঘটনায় কেবল নতুন পরীক্ষার তারিখ ঘোষণার অপেক্ষায় থাকলে চলবে না। প্রশ্নপত্র ফাঁসের উৎস খুঁজে বের করতে হবে। নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করতে হবে এবং তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের শনাক্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
একটি পরীক্ষা স্থগিত হওয়া কর্তৃপক্ষের জন্য হয়তো সামান্য প্রশাসনিক জটিলতা। কিন্তু একজন চাকরিপ্রার্থীর জন্য তা মানে কয়েক মাসের কঠোর প্রস্তুতি, ধার করা টাকা, দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া এবং পরিবারের প্রত্যাশা নিয়ে কেন্দ্রে পৌঁছানোর পর চরম হতাশ হয়ে ফিরে যাওয়া। পরীক্ষা পুনরায় নেওয়া সম্ভব, কিন্তু মানুষের হারানো সময় ও অর্থ কোনোভাবেই ফিরিয়ে দেওয়া যায় না।
সৈয়দ রিফাত মোসলেম মুক্তকণ্ঠের নিজস্ব প্রতিবেদক
মতামত লেখকের নিজস্ব