বরগুনার আমতলী উপজেলায় একটি কলেজের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দায়ের করা মামলায় চার শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এই মামলায় নির্দিষ্ট করে ৩২ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৫০ থেকে ৬০ জনকে আসামি করা হয়েছে। শুক্রবার রাতে গুলিশাখালী ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. রিজাউল কবির বাদী হয়ে আমতলী থানায় এই মামলাটি দায়ের করেন।
শনিবার (১০ অক্টোবর) বিকেলে গ্রেপ্তার হওয়া চার শিক্ষার্থীকে আমতলী সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়। আদালত তাদের শুনানির পর কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
প্রাপ্ত তথ্যানুসারে, গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকাল ১০টার দিকে উপজেলার মহিষকাটা এলাকায় অবস্থিত ইউনুস আলী খাঁন ডিগ্রি কলেজে একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য নবীনবরণ ও আনন্দ উৎসবের আয়োজন করা হয়। উক্ত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক জালাল উদ্দীন ফকির। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্যসচিব তুহিন মৃধা, বরগুনা দ্বিতীয় জজ আদালতের অতিরিক্ত সরকারি কৌঁসুলি (এপিপি) অ্যাডভোকেট জসিম উদ্দিন এবং আমতলী সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের এপিপি মো. মাহবুবুল আলমসহ আরও কয়েকজন অতিথি।
অভিযোগ উঠেছে, অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যের পর কয়েকজন নবীন শিক্ষার্থী ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেন। এই স্লোগান দেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়। জানা গেছে, এই ঘটনায় জালাল উদ্দীন ফকির অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন।
পরবর্তীতে শুক্রবার দুপুরে কলেজের সামনে থেকে কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল কাজী এবং নবীন শিক্ষার্থী মুহিদুল ইসলাম সুজাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। এই অপহরণের ঘটনায় বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট জসিম উদ্দিন, অ্যাডভোকেট মাহবুবুল আলম, জালাল উদ্দীন ফকিরের ছেলে ফাহাদ ফকির এবং ছাত্রদল ও যুবদলের কয়েকজন নেতাকর্মীর নাম সামনে এসেছে।
একই দিনে জুমার নামাজের পর চুনাখালী মসজিদের সামনে থেকে মো. আসিফ ও মো. ইসরাফিল নামে আরও দুই শিক্ষার্থীকে তুলে নেওয়া হয় বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করেছেন। তাদের অভিযোগ, চার শিক্ষার্থীকে উপজেলা বিএনপির দলীয় কার্যালয়ে নিয়ে গিয়ে আটকে রাখা হয়। সেখানে জালাল উদ্দীন ফকিরের উপস্থিতিতে তাদের শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে বলে আসিফের পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে। এরপর রাত ৯টার দিকে চার শিক্ষার্থীকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করা হয়।
তবে মামলার এজাহারে ঘটনার বিবরণ ভিন্নভাবে দেওয়া হয়েছে। এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা থেকে ১টার মধ্যে গুলিশাখালী ইউনিয়নের কালিবাড়ী এলাকার ইউনুস আলী খাঁন ডিগ্রি কলেজে নবীনবরণ অনুষ্ঠান চলাকালীন কয়েকজন ব্যক্তি উচ্চস্বরে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে চলে যান। এই ঘটনার পর সেখানে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
বাদী রিজাউল কবির এজাহারে অভিযোগ করেছেন, তিনি যখন মোটরসাইকেলে করে বাড়ি ফিরছিলেন, তখন ঘটনাস্থলে পৌঁছালে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা তাকে বিএনপির কর্মী বলে গালিগালাজ করেন। একপর্যায়ে তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা চালানো হয় এবং মারধর করা হয়। এতে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত লেগেছে বলে দাবি করা হয়েছে এজাহারে। তার চিৎকারে স্থানীয় লোকজন ও সাক্ষীরা সেখানে উপস্থিত হন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলায় নাম উল্লেখ করা ৩২ জনের মধ্যে বরগুনা জেলা যুবলীগের ক্রীড়া সম্পাদক আল আমিনও রয়েছেন। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ৫০ থেকে ৬০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
আমতলী সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বেঞ্চ সহকারী আবুবকর মুক্তকণ্ঠকে জানান, গ্রেপ্তার শিক্ষার্থী আসিফ আহমেদ, মুহিদুল ইসলাম সুজা, সাইফুল কাজী ও মো. ইসরাফিলকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
আমতলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইয়াকুব হোসাইন মুক্তকণ্ঠকে জানান, ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে চারজনকে গ্রেপ্তার করে থানায় আনা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে দায়ের করা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। শনিবার তাদের আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।