বরগুনার আমতলীতে কলেজের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়াকে কেন্দ্র করে চার শিক্ষার্থীকে তুলে নিয়ে আটকে রেখে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক জালাল উদ্দীন ফকিরের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় কলেজের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ভয়ে কয়েকজন শিক্ষার্থী এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন বলেও জানা গেছে।

শুক্রবার (৯ অক্টোবর) বিএনপির নেতাকর্মীরা শিক্ষার্থীদের তুলে নিয়ে উপজেলা বিএনপির দলীয় কার্যালয়ে আটকে রাখেন বলে অভিযোগ করেছেন তাদের পরিবারের সদস্য ও প্রত্যক্ষদর্শীরা। পরে রাত ৯টার দিকে তাদের আমতলী থানা-পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকাল ১০টার দিকে আমতলী উপজেলার মহিষকাটা ইউনুস আলী খাঁন ডিগ্রি কলেজে একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নবীনবরণ ও আনন্দ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক জালাল উদ্দীন ফকির। বিশেষ অতিথি ছিলেন উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্যসচিব তুহিন মৃধা, বরগুনা দ্বিতীয় জজ আদালতের অতিরিক্ত সরকারি কৌঁসুলি (এপিপি) অ্যাডভোকেট জসিম উদ্দিন এবং আমতলী সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের এপিপি মো. মাহবুবুল আলমসহ অন্য অতিথিরা।

প্রধান অতিথির বক্তব্যের পর কয়েকজন নবীন শিক্ষার্থী ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেন। এ ঘটনার একটি ভিডিও অল্প সময়ের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে জালাল উদ্দীন ফকির ক্ষুব্ধ হন বলে অভিযোগ রয়েছে।

শিক্ষার্থীদের পরিবারের সদস্য ও প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, ওই ঘটনার জেরে শুক্রবার দুপুরে কলেজের সামনে থেকে কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল কাজী ও নবীন শিক্ষার্থী সুজাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এ ঘটনায় বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট জসিম উদ্দিন, অ্যাডভোকেট মাহবুবুল আলম, জালাল উদ্দীন ফকিরের ছেলে ফাহাদ ফকির এবং ছাত্রদল ও যুবদলের কয়েকজন নেতাকর্মীর নাম উঠে এসেছে। এর প্রায় তিন ঘণ্টা পর জুমার নামাজ শেষে চুনাখালী মসজিদের সামনে থেকে মো. আসিফ ও মো. তামিম নামে আরও দুই শিক্ষার্থীকে তুলে নেওয়া হয় বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী অভিযোগ করেন।

পরিবারের সদস্যদের দাবি, চার শিক্ষার্থীকে উপজেলা বিএনপির দলীয় কার্যালয়ে নিয়ে আটকে রাখা হয়। আসিফের পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, সেখানে জালাল উদ্দীন ফকিরের উপস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের নির্যাতন করা হয়। পরে রাত ৯টার দিকে তাদের আমতলী থানা-পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়।

শিক্ষার্থীদের তুলে নেওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর কলেজের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি, কলেজ ও মসজিদের সামনে থেকে বিএনপির নেতাকর্মীরা শিক্ষার্থীদের তুলে নিয়ে যান। এ সময় পুলিশও উপস্থিত ছিল বলে তারা দাবি করেন। তবে পুলিশ কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বলে অভিযোগ তাদের।

কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল কাজীর বাবা মো. মাহবুব কাজী বলেন, আমার ছেলেকে বিএনপির কিছু নেতাকর্মী মহিষকাটা থেকে তুলে নিয়ে গেছেন। সে বিএনপির পার্টি অফিসে আছে বলে জানতে পেরেছি। পরে শুনেছি, তাদের থানায় দেওয়া হবে।

ইউনুস আলী খাঁন ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মো. জাকারিয়া বলেন, বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট জসিম উদ্দিন, অ্যাডভোকেট মাহবুবুল আলম ও জালাল ফকিরের ছেলে ফাহাদ ফকিরের নেতৃত্বে নেতাকর্মীরা সাইফুল কাজী ও সুজা নামের দুই শিক্ষার্থীকে তুলে নিয়ে গেছেন। তাদের থানায় না দিয়ে কোথায় রাখা হয়েছিল কিংবা তাদের সঙ্গে কী করা হয়েছে, তা তিনি জানেন না বলে জানান।

শিক্ষার্থীদের নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক জালাল উদ্দীন ফকির বলেন, দলীয় নেতাকর্মীরা শিক্ষার্থীদের নিয়ে এসে ঘটনার সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতা এবং কার ইন্ধনে এমন ঘটনা ঘটেছে, তা জানতে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। পরে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে থানায় সোপর্দ করা হয়েছে।

আমতলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইয়াকুব হোসাইন বলেন, চারজনকে গ্রেপ্তার করে থানায় আনা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বিশেষ আইনে মামলা করা হয়েছে। শনিবার তাদের আমতলী সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সোপর্দ করা হবে।