পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) রাজধানী ইসলামাবাদমুখী লংমার্চ কর্মসূচি আজ শনিবার সপ্তম দিনে পৌঁছেছে। তবে সেই কর্মসূচি এখনো খাইবার পাখতুনখাওয়ায় পালন করা হচ্ছে। পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের কারামুক্তির দাবিতে এ কর্মসূচি শুরু করেছে পিটিআই।
এর মধ্যেই দেশটির খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের ১২টি জেলায় জরুরি অবস্থা জারির কেন্দ্রীয় সরকারের পরিকল্পনার খবর বেরিয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের এমন পরিকল্পনার সমালোচনা করেছে পিটিআই। দলটি বলেছে, এ পদক্ষেপ সংবিধানের অষ্টাদশ সংশোধনীর সুষ্পষ্ট লঙ্ঘন হবে।
পিটিআইয়ের খাইবার পাখতুনখাওয়া শাখার মুখপাত্র শওকত ইউসুফজাই এক ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘আমি আপনাদের জরুরি অবস্থার কথা জানাতে চাই। জানাতে চাই, ১২টি জেলায় আলাদা প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। এটা অষ্টাদশ সংশোধনীর গুরুতর লঙ্ঘন। আর পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) সব সময় এ সংশোধনীর কৃতিত্ব নিয়ে এসেছে।’
খবর বেরিয়েছে, খাইবার পাখতুনখাওয়ার প্রদেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকার প্রদেশের ১২টি জেলায় জরুরি অবস্থা জারির প্রস্তুতি শেষ করেছে। এসব জেলার প্রশাসনিক ও পুলিশি ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে নেওয়া হবে। এরপরই ইউসুফজাই এ বক্তব্য দেন।
নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণ দেখিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার বারবার খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা বা গভর্নরের শাসন জারির হুমকি দিয়ে আসছে। প্রদেশটির গভর্নর ফয়সাল করিম কুন্ডি বলেছেন, প্রয়োজন হলে এমন পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পিটিআই এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করে আসছে। দলটির নেতারা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, গভর্নরের শাসন বা জরুরি অবস্থা জারি হলে তাঁরা জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ থেকে পদত্যাগ করবেন।
ইউসুফজাই আরও বলেন, পিটিআই কখনো সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে বাধা দেয়নি। দলটি সব সময় দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমর্থন দিয়ে এসেছে।
এই পিটিআই নেতা বলেন, ‘তবে আমরা জোর দিয়ে বলছি, কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে এখানকার সব অংশীজনকে আস্থায় নিতে হবে।’
ইউসুফজাই বলেন, এরই মধ্যে একটি সর্বদলীয় সম্মেলন হয়েছে। সেখানে রাজনৈতিক দল ও অন্য অংশীজনেরা ১৫ দফা ঘোষণায় একমত হয়েছেন। ঘোষণাটি কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে।
পিটিআইয়ের খাইবার পাখতুনখাওয়ার মুখপাত্র বলেন, এ ঘোষণা বাস্তবায়ন করলেই বিষয়টির সমাধান হতে পারে।
ইউসুফজাই বলেন, ১১ অক্টোবর সোয়াবিতে বিপুল মানুষ জড়ো হবেন। সরকার মনে করছে, মানুষ রাস্তায় নামবে না। তাঁর যুক্তি, এ বিক্ষোভ সরকারের সেই ভুল ধারণা ভেঙে দেবে।
জরুরি অবস্থা বা গভর্নরের শাসন দিয়ে পরিস্থিতির সমাধান হতে পারে, এমন ধারণা নাকচ করে দেন ইউসুফজাই। তিনি বলেন, দেশের দরকার রাজনৈতিক সমাধান।
পিটিআইয়ের প্রাদেশিক মুখপাত্র বলেন, ‘আমি মনে করি না, জরুরি অবস্থা বা গভর্নরের শাসন এ সমস্যার সমাধান। এটা কখনোই সমাধান নয়। পাকিস্তানের দরকার রাজনৈতিক সমাধান ও স্থিতিশীলতা। রাজনৈতিক দল ও রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর নির্বিচার বলপ্রয়োগ করে কখনো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনা যায় না।’
ইউসুফজাই সরকারকে ‘জেদ ও অহংকার ছেড়ে আলোচনার টেবিলে এসে সমাধান খোঁজা’র আহ্বান জানান।
পিটিআইয়ের এই নেতা বলেন, তাঁর দল ‘কোনো বেআইনি বা অসাংবিধানিক দাবি’ করেনি। দলটি চায়, হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের রায় বাস্তবায়ন করা হোক। দলের প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানের সঙ্গে সাক্ষাতের ওপর বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হোক এবং তাঁকে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হোক।
ইউসুফজাই সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মামলাগুলোর শুনানি এবং তাঁর বোন ও স্ত্রীর প্রতিকার ও মুক্তির দাবিও জানান। খাইবার পাখতুনখাওয়ায় প্রাদেশিক মন্ত্রী, জাতীয় পরিষদের সদস্য, প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য ও রাজনৈতিক কর্মীদের গ্রেপ্তার নিয়েও উদ্বেগ জানান ইউসুফজাই।
পিটিআই নেতা বলেন, চলমান রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে এসব গ্রেপ্তার বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। এ সংকট সমাধানে আলোচনা ও আন্তরিকতা দরকার।
পিপিপির চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি বলেছিলেন, পিটিআইয়ের উচিত সংঘাতের রাজনীতি ছেড়ে চরমপন্থা এড়ানো। এর জবাবে ইউসুফজাই প্রশ্ন রাখেন, ‘বিলাওয়াল ভুট্টো, নিজের ন্যায্য অধিকারের জন্য আওয়াজ তোলা কি চরমপন্থা? নিজের নেতার পক্ষে আওয়াজ তোলা কি চরমপন্থা?’
ইউসুফজাই বলেন, এ পর্যন্ত রাজনৈতিক পরিবেশের যে অবনতি হয়েছে, তা পুরোপুরি কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের দায়িত্বজ্ঞানহীন ও হুমকিমূলক বক্তব্যের ফল।
দুপক্ষের মধ্যে উত্তেজনা চরমে। এ অবস্থায় সমঝোতা ও মধ্যস্থতাকেই সামনে এগোনোর পথ বলে মনে করেন ইউসুফজাই। তিনি বলেন, ‘শুনেছি, মাওলানা ফজলুর রহমান মধ্যস্থতার ভূমিকায় সক্রিয় হয়েছেন। আমি একে স্বাগত জানাব। পিটিআইও যেকোনো মধ্যস্থতাকে অবশ্যই স্বাগত জানাবে।’
পিটিআইয়ের মুখপাত্র বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি না, বলপ্রয়োগ করে সমস্যার সমাধান হবে। দেশ কতটা কঠিন পরিস্থিতি ও চোরাবালিতে আটকে আছে, তা সবার উপলব্ধি করা উচিত। আমরা যত সমস্যার মুখোমুখি, তার সবই আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যায়।’
ইউসুফজাই আরও বলেন, ‘আশা করি, সরকার এমন কোনো অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপ নেবে না, যা দেশকে আরও কানাগলিতে ঠেলে দিতে পারে।’
সূত্র জানিয়েছে, আজ শনিবার ইসলামাবাদে উচ্চপর্যায়ের একটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এতে প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী ও জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাদের উপস্থিত থাকার সম্ভাবনা আছে।
সূত্রগুলো বলেছে, বৈঠকে জাতীয় নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা হতে পারে। এরপর জরুরি অবস্থা বা গভর্নরের শাসন জারি নিয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব বিবেচনা করা হতে পারে।
প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১২টি জেলায় জরুরি অবস্থা জারি করা হবে। এর মধ্যে আটটি একীভূত উপজাতীয় জেলা ও চারটি বন্দোবস্তভুক্ত (সেটেলড) জেলা।
আটটি একীভূত উপজাতীয় জেলা হলো খাইবার, কুররম, ওরাকজাই, বাজাওর, মোহমান্দ, উত্তর ওয়াজিরিস্তান, দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তান ও লোয়ার ওয়াজিরিস্তান। চারটি বন্দোবস্তভুক্ত জেলা হলো ডেরা ইসমাইল খান, ট্যাংক, বান্নু ও লাক্কি মারওয়াত।
সূত্রগুলো জানায়, এসব জেলার জন্য একটি বিশেষ প্রশাসনিক কাঠামো গড়ার কথা বিবেচনা করা হচ্ছে। এটি হবে প্রাদেশিক সরকারের বিদ্যমান কাঠামো থেকে আলাদা।
সূত্র আরও জানায়, শুরুতে দুই মাসের জন্য জরুরি অবস্থার প্রস্তাব করা হয়েছে। এরপর পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হবে। এ ব্যবস্থার মেয়াদ বৃদ্ধিও করা হতে পারে।
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, ২১তম গ্রেডের একজন সচিবের নেতৃত্বে একটি সচিবালয় গঠন করা হবে। সচিবালয়ে ২১তম গ্রেডের এক পুলিশ কর্মকর্তাকেও নিয়োগ দেওয়া হবে।
সূত্রগুলো বলছে, ‘সচিবালয়ে আরও চার থেকে ছয়জন প্রশাসনিক কর্মকর্তা থাকবেন। তাঁরা প্রশাসন, অর্থ, উন্নয়ন ও পরিকল্পনাসহ অন্যান্য বিষয় দেখবেন।’
সূত্রগুলো আরও জানায়, এই কর্মকর্তাদের সরাসরি নিয়োগ দেবে কেন্দ্রীয় সরকার।
সূত্রের তথ্যমতে, প্রস্তাবিত প্রশাসনিক ব্যবস্থায় সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোর ডেপুটি কমিশনার ও জেলা পুলিশ কর্মকর্তারা সচিবালয়ের কাছে জবাবদিহি করবেন। অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শকও সচিবালয়ের কাছে জবাবদিহি করবেন।
সূত্রগুলো জানায়, প্রস্তাবিত সিদ্ধান্তের কথা প্রাদেশিক সরকারকেও জানানো হয়েছে।
সূত্রগুলো আরও জানায়, প্রস্তাবিত পদক্ষেপ বিবেচনার সময় সংবিধানের ২৩২ থেকে ২৩৪ অনুচ্ছেদের প্রাসঙ্গিক বিধানগুলো খতিয়ে দেখা হতে পারে।
সূত্রগুলো বলে, জরুরি অবস্থা জারি ও গভর্নরের শাসন চালুর সাংবিধানিক প্রক্রিয়া ও আইনি প্রভাব আলাদা। তাই, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে প্রযোজ্য সাংবিধানিক শর্তের ওপর।