কুমিল্লার লালমাইয়ে স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিন (১৪) হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। এই ঘটনায় গ্রেপ্তার অটোরিকশাচালক সুমনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তার দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তাজমিনের ব্যবহৃত আইফোনটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া মোবাইল ফোনের কললিস্ট বিশ্লেষণ করে এই হত্যাকাণ্ডে আরও একাধিক ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং এই ঘটনায় জড়িতদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানাতে শনিবার (১০ অক্টোবর) সকাল ১০টায় একটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছে কুমিল্লা জেলা পুলিশ।

গত শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সন্ধ্যায় কুমিল্লার পুলিশ সুপার (এসপি) আনিসুজ্জামান সাংবাদিকদের এসব তথ্য প্রদান করেন।

পুলিশ সুপার বলেন, “তাজমিন হত্যার মোটিভ অনেকটাই স্পষ্ট হয়েছে। অটোরিকশাচালক সুমন জিজ্ঞাসাবাদে বেশ কিছু তথ্য দিয়েছেন। এ ছাড়া তাজমিনের মোবাইল ফোনের কললিস্ট পর্যালোচনা করে একাধিক ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তদন্তের স্বার্থে এখনই বিস্তারিত জানানো হচ্ছে না। শনিবারের সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হবে।”

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাজমিন হত্যার ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে অটোরিকশাচালক সুমনকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের পর হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে এবং তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই তাজমিনের ব্যবহৃত আইফোনটি উদ্ধার করা হয়েছে।

মোবাইল ফোনের কললিস্টে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এই ঘটনায় অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। তবে হত্যাকাণ্ডে অন্যদের সম্পৃক্ততা ও তাদের পরিচয় সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে এখন পর্যন্ত বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।

গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানখেত থেকে জান্নাতুল তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মরদেহ উদ্ধারের পর তার পরিচয় শনাক্ত করা হয়।

তাজমিন যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়াতলা গ্রামের আব্দুল আলিমের মেয়ে। সে কুমিল্লা নগরীর ফরিদা বিদ্যায়তন স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তবে স্কুল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে সে আর স্কুলে আসছিল না।

তাজমিনের বাবা আব্দুল আলিম রেনেটা ওষুধ কোম্পানির কুমিল্লা অঞ্চলে কর্মরত। পরিবারের সঙ্গে তিনি কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করছিলেন।

পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ অক্টোবর সকালে বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হয় তাজমিন। এরপর থেকেই তার অবস্থান নিয়ে পরিবারের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়।

গত বুধবার (৭ অক্টোবর) রাত ১২টা ১৯ মিনিটে কুমিল্লার হোটেল নূরজাহানের সামনে তাকে সর্বশেষ দেখা যায়। একই রাতে রাত ২টা ৫৮ মিনিটে তাজমিন তার বাবার হোয়াটসঅ্যাপে নিজের লাইভ লোকেশন পাঠিয়ে তাকে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়ে একটি বার্তা পাঠায়। তবে সেই সময় তার বাবা ঘুমিয়ে থাকায় বার্তাটি দেখতে পাননি।

পরদিন সকালে পুলিশ অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে তার মরদেহ উদ্ধার করে। পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পর পুলিশ পরিবারকে বিষয়টি জানায়।

ঘটনাস্থলে মরদেহের পাশে পড়ে থাকা একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা পুলিশ জব্দ করে। এরপরই এই ঘটনার তদন্ত শুরু হয়।

তাজমিনের বাবা আব্দুল আলিম বাদী হয়ে লালমাই থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এই মামলার তদন্তে নেমে ডিবি পুলিশ অটোরিকশাচালক সুমনকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করে।

বর্তমানে পুলিশের সামনে প্রধান প্রশ্নগুলো হলো—কী কারণে তাজমিনকে হত্যা করা হয়েছে, এই ঘটনার সঙ্গে আর কারা জড়িত এবং শেষ রাতে বাবার কাছে লাইভ লোকেশন পাঠানোর পেছনে ঠিক কী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।

পুলিশের দাবি, তদন্তের মাধ্যমে এসব প্রশ্নের উত্তর অনেকটাই স্পষ্ট হয়েছে। তবে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, অন্য কারও সম্পৃক্ততা এবং ঘটনার ধারাবাহিকতা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য শনিবার সকাল ১০টার সংবাদ সম্মেলনের পর জানা যাবে।