কুমিল্লার লালমাইয়ে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে পুলিশ এখন গুরুত্বপূর্ণ কিছু সূত্র খতিয়ে দেখছে। তদন্তের এক পর্যায়ে সামনে এসেছে পদুয়ার বাজার নূরজাহান হোটেলের একটি দোকানে তার আইফোন চার্জ দেওয়ার তথ্য।

তদন্তে জানা গেছে, রায়া ফ্যাশন নামের একটি দোকানে গিয়ে প্রায় ১৫ মিনিট আইফোন চার্জ দিয়েছিল তাজমিন। চার্জ দেওয়ার ওই সময়টুকুতে সে দোকানের আশপাশে হাঁটাচলাও করছিল। পরবর্তীতে ফোনটি নিয়ে সে সেখান থেকে চলে যায়।

দোকানদার রাসেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাজমিন প্রথমে পাশের একটি দোকান থেকে জানতে পারে যে রাসেলের দোকানে মোবাইল চার্জ দেওয়া হয়। এরপর সে নিজেই রাসেলের দোকানে এসে আইফোন চার্জ দেওয়ার অনুমতি চায়।

সেই মুহূর্তের কথা বর্ণনা করে রাসেল বলেন, “সে এসে বলল, আঙ্কেল, মোবাইল চার্জ দেওয়া যাবে? আমি বললাম, আংকেল, দেওয়া যাবে। পরে সে মোবাইল চার্জে দেয়।”

রাসেল আরও জানান, চার্জ দেওয়ার পর তিনি তাজমিনকে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করতে বলেছিলেন। ফলে প্রায় ১৫ মিনিট আইফোন চার্জ হওয়ার সময় তাজমিন দোকানের আশপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। তবে তাদের মধ্যে খুব বেশি কথা হয়নি। রাসেল বলেন, “আমার সঙ্গে তেমন কথা হয়নি। চার্জ হওয়ার পর মোবাইল নিয়ে সে চলে গেছে।”

দোকানদার রাসেলের বক্তব্যে তাজমিনের আইফোন চার্জ দেওয়ার সময়কাল ও দোকানে তার অবস্থানের বিষয়টি পরিষ্কার হলেও, ওই ১৫ মিনিটে তার সঙ্গে অন্য কারও দেখা হয়েছিল কি না কিংবা দোকান থেকে বের হওয়ার পর সে কোন পথে গিয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি।

এদিকে সিসিটিভি ফুটেজে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, বুধবার (৮ অক্টোবর) রাত পৌনে ১২টার দিকে কুমিল্লার পদুয়ার বাজারের নূরজাহান হোটেলের সামনে আইকনিক পরিবহনের একটি বাস থেকে নামে সে। এরপর হোটেলের পশ্চিম পাশে অবস্থিত কয়েকটি স্টেশনারি দোকানের দিকে যায় তাজমিন। সেখানে এক দোকানির সঙ্গে কথা বলে কিছুক্ষণ পর সে মহাসড়কের দিকে চলে যায়।

ফুটেজে আরও দেখা যায়, রাত প্রায় ১২টার দিকে বাস থেকে নামার পর তাজমীনকে দোকানের সামনে কিছু একটা দেখাতে দেখা যায়। দোকানি তাকে কিছু একটা নির্দেশ করছেন বলেও ফুটেজে ধরা পড়েছে। এরপর সে সেখান থেকে সরে অন্য পাশে যায়। রাত সোয়া ১২টার দিকে নূরজাহান হোটেল এলাকা ত্যাগ করতে দেখা যায় তাকে।

তবে ওই এলাকা ছাড়ার পর তাজমীন কোথায় গিয়েছিল, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া যায়নি। পুলিশ এখন তার চলাচলের পথ এবং একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশাকে কেন্দ্র করে তদন্ত চালাচ্ছে। তাজমীনের মরদেহ উদ্ধারের স্থান থেকে কিছুটা দূরে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা জব্দ করা হয়েছে। এই কারণে পুলিশ খতিয়ে দেখছে, নূরজাহান হোটেলের সামনে থেকে সে কোনো অটোরিকশায় উঠে গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হয়েছিল কি না। তবে অটোরিকশাটির সঙ্গে তাজমীনের সম্পৃক্ততা কিংবা তার গন্তব্য সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ভোরে কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কসংলগ্ন লালমাই উপজেলার জগতপুর এলাকার একটি ধানক্ষেত থেকে জান্নাতুল তাজমীনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। জানা গেছে, গত ৪ অক্টোবর বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল তাজমীন। এরপর থেকে তার আর কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। পুলিশি অনুসন্ধানে তার ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কক্সবাজারে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে, তবে এসব স্থানে তার সঙ্গে কেউ ছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

নূরজাহান হোটেলের সামনে বাস থেকে নামা, দোকানে গিয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করা এবং পরে এলাকা ত্যাগ করার মধ্যবর্তী সময়ের ঘটনাগুলো এখন তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে, এলাকা ছাড়ার পর তাজমীন কোন পথে গিয়েছিল, কারও সঙ্গে দেখা হয়েছিল কি না এবং জব্দ করা অটোরিকশাটির সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজছে পুলিশ।

তাজমীনের শিক্ষক সাদ বিন এরশাদ বলেন, “আমি তাকে দীর্ঘদিন পড়িয়েছি। সে খুবই চঞ্চল স্বভাবের ছিল। তার মা কিছুটা অসুস্থ থাকায় দুই যমজ ভাইয়ের দেখভাল করত তাজমীন। তার বাবা একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করতেন। এ কারণে সকালে বাসা থেকে বের হলে রাতে ফিরতেন। তবে বাবা তাজমীনকে খুব আদর করতেন। ঘরে রাগ হলে সে হুটহাট করে বাসা থেকে বের হয়ে যেত। ঘটনার তদন্ত হয়ে দোষীদের শাস্তি হোক সেটাই চাই।”

পুরো বিষয়টি নিয়ে কুমিল্লা পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান বলেন, “আমরা ঘটনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কাজ করছি। আশাকরি রহস্য উদ্‌ঘাটন হবে।”