আবুধাবিতে আফগানিস্তানের বিপক্ষে একমাত্র টেস্ট ম্যাচে অদ্ভুত এক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে প্রথম দিন পার করল বাংলাদেশ। এই দিনটিকে 'অদ্ভুত' বলা ছাড়া অন্য কোনো শব্দ দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন। সাধারণত টেস্ট ক্রিকেটের প্রথম দিনের প্রথম ঘণ্টা বা পুরো সেশনটি ব্যাটারদের জন্য চ্যালেঞ্জিং হয়; বোলাররা পিচ থেকে সহায়তা পান এবং নতুন বলের সুইংয়ে উইকেট পতনের একটি যৌক্তিক কারণ থাকে। কিন্তু আজকের চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ম্যাচের প্রথম তিন ঘণ্টায় বাংলাদেশ মাত্র একটি উইকেট হারিয়েছিল। কিন্তু এরপর নাটকীয়ভাবে মাত্র ৫ রানের ব্যবধানে ৩টি উইকেট হারিয়ে ফেলে তারা। আফগানিস্তানের পেসাররা, যাদের বলের গড় গতি ছিল ১৩০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টার কম, তারা একের পর এক উইকেট তুলে নিতে থাকেন। দিন শেষে ৮ উইকেটে ৩১৭ রান সংগ্রহ করেছে বাংলাদেশ।
দিনের শুরুটা ছিল বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। পিচে বোলারদের তেমন কোনো সুবিধা ছিল না এবং আফগানিস্তানের বোলাররাও তাদের কৌশলে তেমন হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারেননি। প্রথম ঘণ্টায় আফগানিস্তানের একমাত্র সাফল্য ছিল সাদমান ইসলামের ড্রাইভ শটে কাভারে ক্যাচ পাওয়া, যদিও সেটি ধরতে ব্যর্থ হয়েছিলেন হাশমতউল্লাহ শহীদি।
সাদমান এক প্রান্তে কিছুটা ধীরগতিতে ব্যাটিং করলেও, অন্য প্রান্তে বাউন্ডারির পর বাউন্ডারি হাঁটাতে থাকেন তাঁর উদ্বোধনী সঙ্গী তানজিদ হাসান। এক শর বেশি স্ট্রাইক রেটে ব্যাটিং করে মাত্র ৪১ বলে অর্ধশতক পূর্ণ করেন তিনি। তখন মনে হচ্ছিল বড় কোনো রেকর্ডের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন তানজিদ।
বাংলাদেশের দ্রুততম সেঞ্চুরির রেকর্ড ৯৪ বলে এবং টেস্টের প্রথম দিনের প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরির রেকর্ডও এখন পর্যন্ত কেউ করতে পারেননি—আজ এই দুটি রেকর্ডই স্পর্শ করতে পারতেন তানজিদ। তাঁর আক্রমণাত্মক ব্যাটিং সামলাতে না পেরে পেসার ইসমত আলীর বলে স্টাম্পের খুব কাছে এসে কিপিং করার সিদ্ধান্ত নেন ইকরাম আলীখিল।
তানজিদ কি সেই সিদ্ধান্তে বিভ্রান্ত হয়েছিলেন, তা নিশ্চিত নয়। তবে ইসমতের অফ স্টাম্পের বাইরের একটি বলে খোঁচা মেরে তিনি আউট হন। ইকরাম ক্যাচটি ধরতে সক্ষম হলে ৭১ বলে ৮টি চার ও ৪টি ছক্কাসহ ৮৩ রান করে ড্রেসিংরুমে ফিরতে হয় তানজিদকে। তাঁর এই বিদায়ের সাথে সাথে ভেঙে যায় ১২৪ রানের উদ্বোধনী জুটি।
তানজিদের প্রস্থানের পর অর্ধশতক পূর্ণ করেন তাঁর সঙ্গী সাদমান। মোহাম্মদ সেলিমের বলে ৬৭ রানে আউট হওয়া পর্যন্ত সবকিছুই স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল। কিন্তু দ্বিতীয় সেশনের শেষ দিকে হঠাৎ করেই শুরু হয় ব্যাটিং বিপর্যয়।
বিপর্যয়ের শুরু হয় মুমিনুল হকের বিদায়ের মাধ্যমে। ইয়ামিন আহমেদজাইয়ের বলে সাদামাটা এক ক্যাচ দিয়ে তিনি আউট হন। ঠিক তার পরের ওভারেই আউট হয়ে যান মুশফিকুর রহিম; ৭ বল খেলে তাঁর সংগ্রহ ছিল শূন্য। ইয়ামিনের বলটি ইয়র্কার হলেও গতিতে খুব একটা তীব্রতা ছিল না। এক শর বেশি টেস্ট খেলা অভিজ্ঞ মুশফিক এমনভাবে আউট হলেন যেন তাঁর করার কিছুই ছিল না।
মুমিনুল ও মুশফিকের দ্রুত পতনের ধাক্কা সামলাতে না পেরে কায়েস আহমেদের লেগ স্পিনে বিভ্রান্ত হয়ে স্লিপে ক্যাচ দেন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন। মুহূর্তের মধ্যেই ২২১ রানে ২ উইকেট থেকে স্কোরকার্ড হয়ে যায় ২২৫/৫। এই কঠিন পরিস্থিতিতে দলের হাল ধরেন শেষ স্বীকৃত জুটি লিটন দাস ও মেহেদী হাসান মিরাজ। তাঁদের জুটি পঞ্চাশ রান অতিক্রম করেছিল।
তবে লিটনের সাথে ৬২ রানের এই জুটি ভেঙে যায় যখন মিরাজ ইসমতের বল টেনে স্টাম্পে এনে বোল্ড হন। মিরাজের বিদায়ের পর লিটনের রান তোলার গতিও রহস্যজনকভাবে কমে যায়। ফিফটির আগের ৪ রান করতে তাঁর সময় লেগে যায় ১৩ বল। তবে পঞ্চাশ পেরোনোর পরপরই ছক্কা মারতে গিয়ে তিনি আউট হয়ে যান।
টানা তিন ইনিংসে শূন্য রানের ব্যর্থতার পর আজ প্রথম রান করার পর ব্যাট উঁচিয়ে ধরেছিলেন লিটন, এবং ফিফটি করার পর আবারও তা করেন। কিন্তু বেশিদূর যেতে পারেননি তিনি। সেলিমের বলে হুক করে ডিপ স্কয়ারে বল পাঠালেও তা ক্যাচ হয় ইয়ামিনের হাতে। লিটনের সংগ্রহ তখন ৫৩ রান।
লিটনের আউট হওয়ার সময় বাংলাদেশ তিনশ রান অতিক্রম করলেও, সেখান থেকে আরও অনেক দূর এগিয়ে যাওয়া যে কঠিন হবে, তা স্পষ্ট হয়ে যায়। হাসান মাহমুদের আউট হওয়ার পর সেই সম্ভাবনা আরও ক্ষীণ হয়ে এসেছে। ১১ রানে নাঈম এবং ৪ রানে অপরাজিত থাকা তাইজুল আগামীকাল দলকে কতদূর নিয়ে যেতে পারেন, এখন সেটাই দেখার বিষয়।