কুমিল্লায় একের পর এক কিশোর-কিশোরীর রহস্যজনক মৃত্যু ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা যেন থামছেই না। ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রিতমের মৃত্যুর শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই এবার ধানক্ষেত থেকে উদ্ধার করা হলো সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনের মরদেহ। একের পর এক এমন ঘটনায় সাধারণ মানুষের মনে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে—শিশু ও কিশোরদের নিরাপত্তা আসলে কোথায়? আর কত প্রাণ ঝরলে নিরাপদ হবে কুমিল্লা শহর ও তার আশপাশের এলাকা?

এর আগে গত ২৫ এপ্রিল ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার কোটবাড়ি আইরিশ হিল হোটেলের পাশ থেকে কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল।

এরপর গত ১৯ সেপ্টেম্বর কুমিল্লার সানন্দা পাহাড়ি এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয় ১৩ বছর বয়সি শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রিতমের মরদেহ। সে কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। জানা গেছে, মায়ের আইফোন নিয়ে ছবি তুলতে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর সে নিখোঁজ হয়। পরবর্তীতে তার মরদেহ উদ্ধারের পর পুলিশ জানায়, “আইফোন ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে তাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।” ওই ঘটনায় পুলিশ বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করে।

অপ্রিতমের হত্যাকাণ্ডে যখন পুরো কুমিল্লাজুড়ে শোক ও ক্ষোভ বিরাজ করছিল, ঠিক তখনই সামনে এলো আরেক কিশোরীর করুণ পরিণতি। এবার প্রাণ হারাল ১৫ বছর বয়সী জান্নাতুল তাজমিন। সে কুমিল্লা নগরের ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।

গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার পেরুল উত্তর ইউনিয়নের জগতপুর উত্তরপাড়ার মানুমুড়া এলাকার একটি ধানক্ষেত থেকে পুলিশ তার মরদেহ উদ্ধার করে। উদ্ধার করা মরদেহের গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল এবং পাশেই পাওয়া যায় একটি পরিত্যক্ত সিএনজিচালিত অটোরিকশা। দুর্ঘটনাস্থলের আশপাশের ধানক্ষেতে দৌড়াদৌড়ির চিহ্ন দেখা গেছে। এসব আলামত বিশ্লেষণ করে মৃত্যুর আগে ঠিক কী ঘটেছিল, তা নিয়ে নানা রহস্য ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

গত ৪ অক্টোবর বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে কুমিল্লা নগরের রেসকোর্স এলাকার ভাড়া বাসা থেকে বের হয়েছিল তাজমিন। এরপর সে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কক্সবাজারে ঘুরতে যায়। বুধবার রাতে কক্সবাজার থেকে কুমিল্লায় ফিরে পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকার নূরজাহান হোটেলের সামনে নামে। রাতের কোনো একপর্যায়ে বাবাকে লাইভ লোকেশন পাঠিয়ে সেখানে গিয়ে তাকে নিয়ে যাওয়ার কথা জানায় তাজমিন। কিন্তু সেই বার্তাটি তাৎক্ষণিকভাবে দেখতে পারেননি তার বাবা আবদুল আলীম। পরে মেয়েকে খুঁজতে বের হয়ে তিনি জানতে পারেন, যে সন্তানের উদ্ধারের আশায় তিনি ছুটছিলেন, তার নিথর দেহই পাওয়া গেছে ধানক্ষেতে। একজন বাবার কাছে এর চেয়ে নির্মম বাস্তবতা আর কী হতে পারে।

অপ্রিতম ও তাজমিনের ঘটনার প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও দুটি মৃত্যুই শিশু-কিশোরদের নিরাপত্তা, অপরাধ প্রতিরোধ এবং নিখোঁজ হওয়ার পর দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার গুরুত্বকে নতুন করে সামনে এনেছে। কুমিল্লার অভিভাবকদের মনে এখন তীব্র শঙ্কা—সন্তান বাড়ি থেকে বের হলে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থাগুলো আসলে কতটা কার্যকর?

কুমিল্লা নাগরিক আন্দোলন বাংলাদেশের সভাপতি ডা. আতিকুল ইসলাম বলেন, “অপ্রিতমের পর তাজমিনের মর্মান্তিক মৃত্যু কুমিল্লার মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে। শিশু-কিশোরদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, প্রশাসন ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। শুধু ঘটনার পর গ্রেপ্তার নয়, অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। আমরা চাই, কোনো পরিবারকে যেন আর সন্তানের এমন পরিণতির মুখোমুখি হতে না হয়।”

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও ভারপ্রাপ্ত বিভাগীয় প্রধান সাদিয়া তাবাসসুম তমা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “শিশু-কিশোরদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ড প্রতিরোধে আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং তদন্তের স্বচ্ছতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে অপরাধের প্রকৃতি, প্রমাণ ও সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করতে হবে।”

তিনি আরও বলেন, “একই সঙ্গে নিখোঁজের অভিযোগ পাওয়ার পরপরই দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ, আলামত সংরক্ষণ এবং নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়ায় বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। অপরাধের বিচারহীনতার সংস্কৃতি যেন গড়ে না ওঠে, সে জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি শিশুদের নিরাপত্তায় পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।”