পুরোনো ঋণ কর্মসূচি বাতিলের পর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে নতুন করে ঋণ চুক্তিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। এই নতুন কর্মসূচির আওতায় প্রাথমিক পর্যায়ে ৪৫০ কোটি ডলার ঋণের বিষয়ে আলোচনা চলছে। তিন বছর মেয়াদী এই নতুন কর্মসূচির চূড়ান্ত চুক্তি আগামী ডিসেম্বর মাসে স্বাক্ষরিত হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। বর্তমানে ঋণের শর্তাবলি নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে দর-কষাকষি চলছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, শর্তগুলোর মধ্যে ব্যাংক ও রাজস্ব খাতের সংস্কারের পাশাপাশি বিভিন্ন খাতে সরকারি ভর্তুকি কমানোর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হচ্ছে।

আগামী সোমবার থেকে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভা শুরু হতে যাচ্ছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল এই সাত দিনব্যাপী সভায় যোগ দেবে। সেখানে আইএমএফের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নতুন ঋণের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে বলে জানা গেছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন এই পরিস্থিতি নিয়ে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “ব্যাংক ও রাজস্ব খাতে সংস্কার, ভর্তুকি কমানোসহ বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রমের দীর্ঘসূত্রতার কারণে আগের ঋণ কর্মসূচি এগোয়নি। সেই একই ধরনের সংস্কারের কথা এবারও বলবে আইএমএফ। তাদের অবস্থানের পরিবর্তন তো হবে না।” দেশের বিশেষজ্ঞরা একই ধরনের সংস্কারের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছেন এবং মনে করেন এসব সংস্কার বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের দাবি।

জাহিদ হোসেন আরও বলেন, “এসব সংস্কার আটকে রেখে নতুন ঋণ কর্মসূচির আলোচনা করা সময়ের অপচয়। এসব সংস্কার জাতীয় স্বার্থেই করতে হবে। আইএমএফের মতো সংস্থা থাকলে একটি সময়সীমা থাকে, সংস্কারের চাপ থাকে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে বিশেষ কোনো অগ্রগতি নেই এবং অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের চাপ ক্রমাগত বাড়ছে খরচের বোঝা সামলাতে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন ঋণের শর্তগুলো মূলত পুরোনো কর্মসূচি থেকেই নেওয়া হয়েছে। তবে আগের কর্মসূচিতে শর্ত পূরণের জন্য যে নির্দিষ্ট সময়সীমা ছিল, তা অতিক্রান্ত হয়ে যাওয়ায় অনেক সংস্কার করা সম্ভব হয়নি। নতুন ঋণ চুক্তির মাধ্যমে এসব সংস্কার কার্যক্রম সম্পন্ন করতে বাড়তি সময় পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

নতুন এই ঋণ কর্মসূচির শর্তাবলির মধ্যে প্রধানত বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারব্যবস্থার ওপর ছেড়ে দেওয়া, রাজস্বনীতি ও আদায় প্রক্রিয়া আলাদা করা, করছাড় যৌক্তিক করা, দেউলিয়া আইন প্রণয়ন এবং সরকারি ভর্তুকি কমানোর বিষয়গুলো প্রাধান্য পেয়েছে। গত মে মাস থেকে এই নতুন কর্মসূচি নিয়ে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়, যা কখনো সশরীরে আবার কখনো ভার্চুয়ালি সম্পন্ন হয়েছে।

ব্যাংককে অনুষ্ঠিত আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভায় এই ঋণের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হবে। এছাড়া আগামী নভেম্বর মাসে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করতে পারে। ওই সফরের সময়েই ঋণের শর্ত ও সংস্কারের বিষয়গুলো চূড়ান্ত হবে এবং চূড়ান্ত দর-কষাকষির পর ডিসেম্বরে চুক্তি হতে পারে।

গত মে মাসে নতুন কর্মসূচিতে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়ার সময় অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “পুরোনো কর্মসূচিটি ভিন্ন অর্থনৈতিক ও নীতিগত পরিপ্রেক্ষিতে গ্রহণ করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে উদ্ভূত দেশি প্রেক্ষাপট, রাজনৈতিক অর্থনীতি ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে কিছু সংস্কার বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়।”

উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি বাংলাদেশ ৪৭০ কোটি ডলারের একটি ঋণচুক্তি অনুমোদন করেছিল, যার জন্য ২০২২ সালের জুলাই মাসে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার চিঠি দিয়েছিল। সেই ঋণের ৭টি কিস্তির মধ্যে ৫ কিস্তিতে ৩৬৪ কোটি ডলার এসেছে। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৫ সালের জুনের মধ্যে এই কর্মসূচির আকার ৮০ কোটি ডলার বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলারে উন্নীত করা হয়। তবে পরিবর্তিত অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং কঠিন শর্তের কারণে বর্তমান সরকার তা এগিয়ে নিতে আগ্রহী ছিল না, যা গত এপ্রিল মাসে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন সভায় জানানো হয়। এরপর ৩ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন ঋণ কর্মসূচির জন্য চিঠি দেয় সরকার, যাকে আইএমএফ স্বাগত জানায়।

পুরোনো ঋণের আওতায় ২০২৭ সালের মধ্যে পুরো ৫৫০ কোটি ডলার পাওয়ার কথা থাকলেও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অনেক সংস্কার সম্পন্ন হয়নি। যেমন, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এনবিআর বিলুপ্ত করে রাজস্বনীতি ও আদায় বিভাগ আলাদা করার শর্ত ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশ জারি করলেও বর্তমান সরকার তা আইনে পরিণত করেনি। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহর নেতৃত্বে একটি কমিটি এই বিষয়টি পর্যালোচনা করছে, তবে তারা এখনো প্রতিবেদন জমা দেয়নি। এছাড়া ২০২৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে যৌক্তিক করছাড় বাদ দেওয়া এবং জিডিপির আধা শতাংশ অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি।

ব্যাংক খাতে বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়ার শর্ত পূরণ না হলেও কিছু অগ্রগতি দেখা গেছে। ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন প্রণয়ন এবং পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করা হয়েছে। তবে জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি কমানোর ক্ষেত্রে তেমন অগ্রগতি হয়নি, বরং ভর্তুকির পরিমাণ বেড়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সেই সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, “সরকার সংস্কার থেকে সরে আসতে চায় না; বরং বাস্তবসম্মত, ধাপে ধাপে এবং দেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নে আগ্রহী।”

এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে, আরও হবে। আমরা নতুন ঋণ কর্মসূচি এগিয়ে নিতে চাইছি, ফিরে আসার কোনো সুযোগ নেই। আশা করছি এবারের বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক বৈঠকে এ বিষয়ে ভালো অগ্রগতি হবে। এর আগে আইএমএফের ঋণবিষয়ক অর্থমন্ত্রীর এক বক্তব্যকে বিকৃত করা হয়েছে, যা হতাশাজনক।”