দেশের পুঁজিবাজারের সামগ্রিক চিত্র আগামী এক বছরের মধ্যেই পরিবর্তিত হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি জানান, বাজারে বিনিয়োগের বিষয়ে বর্তমানে দেশ ও বিদেশ উভয় জায়গাতেই ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা না ঘটলে এবং বর্তমান পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকলে এক বছরের মধ্যেই বাজারে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে রোববার পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) আয়োজিত 'বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ'-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এই কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খানের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজার বিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর শাহরিয়ার গনি, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধটি উপস্থাপন করেন বিএসইসি কমিশনার তানভীর হাবিব রহমান।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের পুঁজিবাজারের আকার এখনো ছোট। এই বাজারের পরিসর বড় করতে হবে এবং সে জন্য ভালো কোম্পানি, সুশাসন ও স্বনিয়ন্ত্রণের পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। ভালো কোম্পানি ও সুশাসনে বিশ্বাসী প্রতিষ্ঠানগুলো এমন বাজারে আসবে না, যেখানে স্বচ্ছতা ও আস্থার ঘাটতি রয়েছে। যারা ভালো কোম্পানি, যারা সুশাসনে বিশ্বাস করে, তারা ক্যাসিনো (জুয়ার) বাজারের অংশ হবে না। তাই বাজারের বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরিতে সবাইকে মিলে তৈরি করতে হবে।’

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের প্রতি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ক্রমবর্ধমান আগ্রহের কথা উল্লেখ করে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, সম্প্রতি নিউইয়র্কের ওয়াল স্ট্রিটে তাঁর সফরকালে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি ইতিবাচক সাড়া পেয়েছেন তিনি। তিনি জানান, ওয়াল স্ট্রিটের একটি অনুষ্ঠানে ১৬টি কোম্পানি অংশ নিয়েছিল, যাদের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ ছিল ৩৬ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। অর্থমন্ত্রী উল্লেখ করেন যে, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশ সম্পর্কে যথেষ্ট তথ্য রাখেন। দেশের বর্তমান নেতৃত্ব, সরকারের ঘোষিত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, বাজারের স্বচ্ছতা এবং পেশাদারিত্বের বিষয়ে তাঁদের আস্থা তৈরি হয়েছে এবং অনেকেই এখন বাংলাদেশে বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছেন।

দেশের আর্থিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের কথা জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণের ওপর নির্ভর করে দেশ পরিচালনার দিন শেষ করতে হবে। এই লক্ষ্যে নিউইয়র্কে ডলার বন্ড, হংকংয়ে বাংলাদেশভিত্তিক বিনিয়োগ তহবিল, পান্ডা বন্ড, সামুরাই বন্ড এবং স্থানীয় মুদ্রার বন্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এই প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, ‘বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিপির টাকা দেবে আর আমরা দেশ চালাব, সেই দিন শেষ। আমরা দেশের আর্থিক কাঠামো পরিবর্তন করছি।’

২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছাতে হলে আন্তর্জাতিক ঋণ ও সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনতে হবে বলে অর্থমন্ত্রী মনে করেন। তাঁর মতে, দেশের প্রয়োজনীয় অর্থের একটি বড় অংশ নিজস্ব এবং আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজার থেকে সংগ্রহ করতে হবে। পুঁজিবাজারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে তাদের দায়িত্ব নিজস্ব নিয়ন্ত্রণে যথাযথভাবে পালন করতে হবে।

সভাপতির বক্তব্যে বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেন, দেশের পুঁজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। পেনশন ফান্ড, গ্র্যাচুইটি ফান্ড এবং বিমা কোম্পানিগুলোর অর্থের একটি অংশ যাতে পুঁজিবাজারের করপোরেট বন্ড ও শেয়ারে বিনিয়োগ করা যায়, সে লক্ষ্যে ভবিষ্যতে নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বিমা খাতকে পুঁজিবাজারের জন্য একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দীর্ঘকাল নিষ্ক্রিয় থাকা এই খাতকে পুঁজিবাজারে আরও সক্রিয় করতে হবে।

অন্যদিকে, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের সবচেয়ে বড় মাইলফলক হচ্ছে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা। পুঁজিবাজার অতীতে বিভিন্ন অনিয়ম ও অদক্ষতার মধ্য দিয়ে গেছে। সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে হলে যত ধরনের সংস্কারই করা হোক না কেন, সেগুলো সফল করার মূল শর্ত হলো বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা। বিশেষ করে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের বিভিন্ন ধরনের প্রলোভন ও প্রতারণা থেকে সুরক্ষা দিতে হবে।’