পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে নবাগত জেলা প্রশাসকের (ডিসি) সাথে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় অস্ত্র আইনের মামলায় পুলিশের অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি এবং বহিষ্কৃত বিএনপি নেতা জাহাঙ্গীর হোসেন ফরাজীর উপস্থিতি ও বক্তব্য নিয়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার উপজেলা প্রশাসনের অফিসার্স ক্লাবে এই সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে জাহাঙ্গীর হোসেন ফরাজী উপস্থিত থেকে বক্তব্য প্রদান করেন, যার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই সমালোচনা শুরু হয়েছে।
জানা গেছে, জাহাঙ্গীর হোসেন ফরাজী একসময় মির্জাগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করলেও পরবর্তীতে সেই পদ থেকে বহিষ্কৃত হন। তবে গতকালের ওই বিশেষ সভায় তিনি পটুয়াখালী-১ (সদর, মির্জাগঞ্জ ও দুমকী) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ আলতাফ হোসেন চৌধুরীর প্রতিনিধি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন এবং অতিথিদের মাঝে পর্যায়ক্রমে নিজের বক্তব্য পেশ করেন।
সদ্য নিযুক্ত জেলা প্রশাসক চৌধুরী আশরাফুল করীম উক্ত সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ মো. রাসেলের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন মির্জাগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) খান নুরুল ইসলাম, উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি গোলাম ফারুক মুন্সি ও আমিনুল ইসলাম, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশিদ মুন্সি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান মনির, সাবেক সভাপতি আলহাজ আশ্রাফ আলী হাওলাদার, সদস্য অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান, শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক দুলাল হোসেন এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, ছাত্র প্রতিনিধি ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। পুরো সভাটি সঞ্চালনা করেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) ইলিয়াস মিয়া।
পুলিশি তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ নভেম্বর ভোরে মির্জাগঞ্জ সেনা ক্যাম্পের এক বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে জাহাঙ্গীর হোসেন ফরাজীকে তাঁর নিজ বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের সময় তাঁর কাছ থেকে একটি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন এবং দুটি গুলি উদ্ধার করা হয় বলে জানা গেছে।
গ্রেপ্তারের পর জাহাঙ্গীরকে মির্জাগঞ্জ থানায় হস্তান্তর করা হয়। পরবর্তীতে ৭ নভেম্বর ওই থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) এনামুল হক বাদী হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলা দায়ের করেন। একই বছরের ৬ ডিসেম্বর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) খান নুরুল ইসলাম তাঁর বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। বর্তমানে মামলাটি পটুয়াখালী জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে এবং মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ প্রক্রিয়া চলছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, অস্ত্রসহ গ্রেপ্তারের পর একই বছরের ৭ নভেম্বর বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহদপ্তর সম্পাদক মনির হোসেনের স্বাক্ষরিত আদেশে জাহাঙ্গীর হোসেন ফরাজীকে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পদ এবং দলের সাধারণ সদস্যপদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। তবে ২০২৫ সালের নভেম্বরে তৎকালীন দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর স্বাক্ষরিত আরেকটি আদেশের মাধ্যমে তাঁর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয় এবং তাঁকে প্রাথমিক সদস্যপদ ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
জেলা প্রশাসকের ওই মতবিনিময় সভায় অংশ নেওয়া উপজেলা বিএনপির এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘জাহাঙ্গীর হোসেনের বিরুদ্ধে সংগঠন পরিপন্থী অসংখ্য অভিযোগ আছে। অথচ এই বিতর্কিত ব্যক্তি এখন স্থানীয় সংসদ সদস্যের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছেন। যা দল ও সমাজের জন্য অপ্রত্যাশিত। এমপির বিরুদ্ধে যাওয়ার সুযোগ না থাকায় আমাদের নীরব থাকতে হচ্ছে।’
সভায় জাহাঙ্গীরের উপস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মজিবুর রহমান বলেন, পুলিশের অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি জাহাঙ্গীর হোসেনের অংশগ্রহণ এবং বক্তব্য দেওয়াকে কেন্দ্র করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এটা কোনোভাবেই প্রত্যাশা করা যায় না।
এই পুরো বিষয়ে জাহাঙ্গীর হোসেন ফরাজীর মতামত জানতে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
অন্যদিকে, জাহাঙ্গীর হোসেন যে স্থানীয় সংসদ সদস্যের প্রতিনিধি হিসেবে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেন, তা নিশ্চিত করেছেন ইউএনও শেখ মো. রাসেল। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘সংসদ সদস্যের পরমর্শে তাঁকে (জাহাঙ্গীর) আমাদের অনুষ্ঠানেও আমন্ত্রণ করা হয়েছে। মামলাটি আগের হওয়ায় বিষয়টি আমার নজরে ছিল না।’
পুরো বিষয়টি নিয়ে পটুয়াখালী-১ আসনের সংসদ সদস্য আলতাফ হোসেন চৌধুরী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘একজন ভালো মানুষকে আজকাল কীভাবে চোর বানিয়ে ফেলে! তাঁর (জাহাঙ্গীর) কাছে কোনো অস্ত্র ছিল না, কীভাবে পেল, কোথায় পেল, তা আমি জানি না। তবে আমি যতটুকু জানি, তিনি রাজনৈতিকভাবে ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন।’