জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির একজন নেতার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক জমি লিখে নেওয়ার চেষ্টা, হয়রানি এবং হুমকির গুরুতর অভিযোগ তুলেছে একটি পরিবার। ওই পরিবারের প্রধান আলতাফ হোসেনের দাবি, জমি লিখে না দিলে এমনকি তাঁদের কবর দেওয়ার সুযোগও দেওয়া হবে না বলে হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
আজ বৃহস্পতিবার দুপুর একটার দিকে ফরিদপুর প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আলতাফ হোসেন এসব অভিযোগ উত্থাপন করেন।
৮২ বছর বয়সী আলতাফ হোসেন ফরিদপুর সদরের গেরদা ইউনিয়নের নিখুরদী গ্রামের বাসিন্দা। তিনি দুই ছেলে ও এক মেয়ের বাবা। অভিযুক্ত সুলায়মান হোসাইনও ওই এলাকার বাসিন্দা এবং তিনি কৃষক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহদপ্তর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যের মাধ্যমে আলতাফ হোসেন জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে সুলায়মান তাঁদের জমি দখল করতে চেষ্টা করছেন এবং নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির মাধ্যমে হয়রানি করে আসছেন। বিশেষ করে পাঁচটি দাগের প্রায় ৫৯ শতক জমি দখলের জন্য তাঁদের ওপর ক্রমাগত চাপ ও হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এই বিষয়ে সালিশ-মীমাংসার চেষ্টা করা হয়েছে এবং বিষয়টি থানা থেকে আদালতে গেলেও সুলায়মান হেরে যান। তা সত্ত্বেও জোরপূর্বক জমি লিখে নেওয়ার চাপ অব্যাহত রয়েছে বলে তিনি জানান।
আলতাফ হোসেন আরও অভিযোগ করেন যে, তাঁর ছোট ছেলে ইউসুফ হোসেন নূর বর্তমানে মাগুরায় পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) হিসেবে কর্মরত। এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় সুলায়মান উচ্চপর্যায়ে তদবির করছেন যাতে তাঁর ছেলেকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ইউসুফ নূর বাদী হয়ে ২০২৩ সালে ভূমি প্রতিরোধ আইনে সুলায়মানের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন। এই প্রসঙ্গে আলতাফ হোসেন বলেন, “এতে ক্ষিপ্ত হয়ে জুলাই আন্দোলনে আমার ছেলের নামে মিথ্যা হত্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া যেখানেই কর্মরত থাকে, সেখানে গিয়ে বিএনপির নেতাদের দিয়ে পুলিশ সুপারের কাছে অভিযোগ করেন (সুলায়মান)।”
ভূমি প্রতিরোধ আইনের ওই মামলায় আদালত সম্প্রতি সুলায়মানের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন বলে আলতাফ হোসেন জানান। তিনি আরও জানান, গত ৮ জুলাই কোতোয়ালি থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সমীর কুমার দাস যখন সুলায়মানকে গ্রেপ্তার করতে যান, তখন সুলায়মান তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার হুমকি দেন এবং গালাগাল করেন। এই ঘটনার একটি অডিও রেকর্ড সংবাদ সম্মেলনে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর কাছে নিরাপত্তা চেয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে আলতাফ হোসেন বলেন, “আমার বসতঘর থেকে সুলায়মানের বসতঘরের দূরত্ব ১০ ফিটের মতো। বাড়িতে এসেই রাতের বেলা আমার ঘরে ঢুকে সাদা কাগজে স্বাক্ষর দিতে বলে এবং বলে, “কাগজে সই করে দাও, নইলে মরলে কবরে মাটি দিতে দেব না”।”
অন্যদিকে, এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন কৃষক দল নেতা সুলায়মান। তাঁর দাবি, “আমার বিরুদ্ধে সব অভিযোগ বানোয়াট। জমিগুলো নিয়ে আমার বাবার নামে দলিল আছে। বাবার মৃত্যুর পর থেকে ওই জমি দখল করে ছোটবেলায় আমাদের উচ্ছেদ করে দিয়েছিল। আমার বাবার বৈধ জমি বুঝে নিতে গেলে এই বিরোধ শুরু হয়।”
সুলায়মান আরও দাবি করেন, “বিষয়টি নিয়ে শহিদুল ইসলাম বাবুল ভাইয়ের (কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক ও ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য) বাড়িতে এক সালিসের সিদ্ধান্তের পর আলতাফ হোসেন স্বাক্ষর করে। কিন্তু বাড়িতে ফিরেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জমি বুঝিয়ে দেয়নি।” তিনি স্পষ্টভাবে জানান, কখনো সাদা কাগজে তাঁর স্বাক্ষর নেওয়া হয়নি এবং বর্তমানে আদালতে বণ্টন মামলা চলমান থাকায় এটি আদালতের বিচার্য বিষয়।
ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার এসআই সমীর কুমার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ৮ জুলাই রাতে তিনি পরোয়ানা তামিল করতে সুলায়মানের বাড়িতে যান। উনি প্রথমে তাঁর সঙ্গে উগ্র আচরণ করেন। পরে তিনি (সুলায়মান) ফোনে কৃষক দলের এক কেন্দ্রীয় নেতাকে ধরিয়ে দেন। কৃষক দলের ওই কেন্দ্রীয় নেতা তাঁকে পরামর্শ দিয়ে বলেন, সুলায়মান অসুস্থ। উনি আগামীকাল কোর্টে গিয়ে আত্মসমর্পণ করবেন। পরদিন সুলায়মান আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করলে আদালত জামিন মঞ্জুর করেন।
জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সৈয়দ মোদাররেস আলী মুক্তকণ্ঠকে জানান, বিষয়টি সম্পর্কে তাঁর কোনো কিছু জানা নেই। তবে তিনি বলেন, আদালতের নির্দেশে কেউ জমি ফিরে পেলে, সেই জমিতে ভোগদখলে আইনগত কোনো বাধা নেই। তবে বিএনপির নাম ভাঙিয়ে কেউ যদি অন্যায় কাজ করে থাকে, তাহলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে আইনি ব্যবস্থা দল নিতে পারে।