বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়েছে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে একজন মানুষের প্রাপ্তি বলতে চাওয়া থাকে একটু শান্তি, নিরাপদ আশ্রয় আর আপনজনের পাশে শেষনিশ্বাস ফেলার নিশ্চয়তা। কিন্তু ৮২ বছরের বৃদ্ধ আলতাফ হোসেনের দিন কাটছে চরম আতঙ্কে।

জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে তাকে নানাভাবে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে এমন অভিযোগ করেছেন ফরিদপুর সদর উপজেলার গেরদা ইউনিয়নের নিখুঁরদী গ্রামের এই বৃদ্ধ। তার দাবি, জমি লিখে দেওয়ার চাপের পাশাপাশি তাকে হুমকি দিয়ে বলা হয়েছে ‘জমি লিখে না দিলে মরার পর কবরেও মাটি দিতে দেওয়া হবে না।’ সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলতে গিয়ে বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন আলতাফ হোসেন। একপর্যায়ে চোখের পানি মুছতে মুছতে তিনি নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) দুপুর ১টার দিকে ফরিদপুর প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে নিজের ও পরিবারের ওপর চলা হয়রানি, জমি নিয়ে বিরোধ এবং ছেলের চাকরি নিয়ে শঙ্কার কথা তুলে ধরেন তিনি। আলতাফ হোসেনের অভিযোগের তির বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কৃষকদলের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা সুলতান সুলাইমানের দিকে।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে আলতাফ হোসেন বলেন, “সুলতান সুলাইমান তাদের প্রতিবেশী। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে তাদের জমি দখলের চেষ্টা, চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি, মামলা-মোকদ্দমা ও বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হচ্ছে।”

বৃদ্ধের দাবি, পাঁচটি দাগে প্রায় ৫৯ শতক জমি নিয়ে বিরোধ চলছে। জমিগুলোর বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে তা দখলের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তিনি জানান, বিরোধ মীমাংসায় স্থানীয় সালিশ, থানা ও আদালত পর্যন্ত গড়ানো হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি। বরং বর্তমানে তাকে জোর করে জমি লিখে দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে।

আলতাফ হোসেন আক্ষেপ করে বলেন, “বয়স হয়েছে। জীবনের শেষ সময়ে এসে কারও সঙ্গে বিরোধ চাই না। নিজের কেনা জমিতে শান্তিতে থাকতে চাই। কিন্তু দিনদিন ভয় আর চাপের মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে।”

আলতাফ হোসেনের ছোট ছেলে ইউসুফ হোসেন নূর পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) হিসেবে বর্তমানে মাগুরায় কর্মরত। বৃদ্ধের অভিযোগ, জমি বিরোধের প্রতিবাদ করায় তার ছেলের ওপরও চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এমনকি তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করানোর জন্য উচ্চপর্যায়ে তদবির চালানো হচ্ছে।

তিনি জানান, ২০২৩ সালে ইউসুফ নূর বাদী হয়ে সুলতান সুলাইমানকে আসামি করে ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনে একটি মামলা করেন। এরপর থেকে বিরোধ আরও তীব্র হয়। আলতাফ হোসেনের দাবি, জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে তার ছেলের বিরুদ্ধেও হত্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। এমনকি ছেলের কর্মস্থল পরিবর্তন হলেও সেখানে গিয়ে নানা অভিযোগ দেওয়া হচ্ছে।

আলতাফ হোসেন জানান, ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ আইনের মামলায় সম্প্রতি সুলতান সুলাইমানের বিরুদ্ধে আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। এরপর গত ৮ জুলাই কোতোয়ালি থানার এসআই সমীর তাকে গ্রেপ্তার করতে গেলে তাকে চাকরিচ্যুত করার হুমকি দেওয়া হয় এবং অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত আসে যখন নিজের নিরাপত্তার কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন আলতাফ হোসেন। তিনি বলেন, তাদের বসতঘর থেকে সুলতান সুলাইমানের বাড়ির দূরত্ব মাত্র কয়েক ফুট। রাতে বাড়িতে এসে সাদা কাগজে স্বাক্ষর করার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছে।

ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, “আমি বৃদ্ধ মানুষ। আমার কী হবে জানি না। শুধু চাই, নিজের বাড়িতে নিরাপদে থাকতে। আমার ছেলের চাকরিটাও যেন নষ্ট না হয়।”

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, সাদা কাগজে স্বাক্ষর না করলে মৃত্যুর পর কবর দিতে দেওয়া হবে না বলেও তাকে হুমকি দেওয়া হয়েছে। জীবনের শেষ বয়সে এসে জমি, বসতভিটা ও সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে এই আশঙ্কাই এখন তার সবচেয়ে বড় আতঙ্ক।

এসব বিষয়ে কৃষকদল নেতা সুলতান সুলাইমান হোসেন তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ বানোয়াট দাবি করেছেন। তিনি জানান, বিরোধপূর্ণ জমিগুলো তার বাবার নামে বৈধ দলিলভুক্ত সম্পত্তি।

সুলাইমানের ভাষ্য, তার বাবা মারা যাওয়ার পর ওই জমি আলতাফ হোসেন দখলে নেন এবং তাদের ছোটবেলায় সেখান থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল। বাবার বৈধ জমি বুঝে নিতে গেলে নতুন করে বিরোধের সৃষ্টি হয়।

তিনি আরও বলেন, কৃষকদলের সাধারণ সম্পাদক ও ফরিদপুর-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম বাবুলের বাড়িতে এ বিষয়ে সালিশ হয়েছিল। সেখানে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের পর আলতাফ হোসেন স্বাক্ষর করেছিলেন, কিন্তু বাড়ি ফিরে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জমি বুঝিয়ে দেননি।

সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে সুলাইমান দাবি করেন, বর্তমানে বিষয়টি নিয়ে আদালতে বণ্টন মামলা চলমান রয়েছে। ফলে জমির মালিকানা ও দখল নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতের বিচার্য বিষয়।