বরেন্দ্র অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমে অবনতির দিকে যাচ্ছে। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁর ২৫টি উপজেলা, ৪৭টি ইউনিয়ন এবং ১ হাজার ৫০৩টি মৌজা ‘অতি উচ্চ পানিসংকটাপন্ন এলাকা’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই অঞ্চলে ৮৭ লাখের বেশি মানুষ সরাসরি পানির অভাবে ভুগছেন। কিন্তু সংকট মোকাবিলায় সরকারের পদক্ষেপ মাঠপর্যায়ে কার্যকর হয়নি; কৃষকেরা বোরো চাষ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ঘুরপাক খাচ্ছেন।

মুক্তকণ্ঠের প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, গত বছরও সরকারি অনুমোদিত মোটর ব্যবহার করে কৃষকেরা বোরো ধান চাষ করেছিলেন। কিন্তু এ বছর এই ধরনের মোটর ব্যবহারে সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ফলে কৃষকেরা বিপাকে পড়েছেন। আইন স্পষ্ট, পানিসংকটাপন্ন এলাকায় খাওয়ার পানি ছাড়া ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন দণ্ডনীয়।

বিষয়টি কেবল আইনগত নয়, এটি নৈতিক ও নীতিগত প্রশ্নও। কৃষক ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা, খাদ্য উৎপাদন ও জীবিকা নির্ভর করছে সেই পানির ওপর, যা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। পানিসাশ্রয়ী ফসল চাষ ও গভীর নলকূপ স্থাপন বন্ধ করার পরামর্শ থাকলেও, বাস্তবতায় কৃষককে এমন নির্দেশনা প্রদান করা হয়নি, যা তাঁকে নিরাপদ বিকল্প নিশ্চিত করতে পারে।

মুক্তকণ্ঠের এ–সংক্রান্ত গোলটেবিল বৈঠক এবং পানিবিশেষজ্ঞদের মতামত স্পষ্ট করে দিয়েছে—বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির ন্যায্য সমবণ্টন ও যথাযথ ব্যবহার ছাড়া খাদ্যনিরাপত্তা, জীবনধারা, স্বাস্থ্যসহ সব ক্ষেত্রেই সংকট প্রকট হবে। এ অবস্থায় পানির স্থায়িত্ব এবং প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে প্রতিটি উপজেলায় খাল সংরক্ষণ, ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহারের সম্প্রসারণ এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের প্রযুক্তি জনপ্রিয়করণ জরুরি।

উদ্ভূত সংকট মোকাবিলায় মাঠপর্যায়ে স্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান অপরিহার্য। কোন জমিতে কতটুকু পানি ব্যবহার করা যাবে, কোনো এলাকায় নতুন নলকূপ স্থাপন করা যাবে কি না—সবকিছু সুনির্দিষ্টভাবে কৃষককে জানাতে হবে। পানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী সেচব্যবস্থার সম্প্রসারণ ঘটাতে হবে। মাইক্রো-ইরিগেশন, ড্রিপ সেচ ও রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং সম্পর্কে কৃষককে ধারণা দিতে হবে। কৃষকদের অর্থনৈতিক ও প্রণোদনামূলক সহায়তা দিতে হবে, যাতে তাঁরা ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে ব্যবহার করতে বাধ্য না হন। স্থানীয় স্তরে সচেতনতা বৃদ্ধি ও শিক্ষামূলক কর্মশালার আয়োজন করতে হবে, যাতে কৃষক জানতে পারেন, সংরক্ষিত পানি তাঁর জীবিকা ও এলাকার জন্য কত অপরিহার্য।

এভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করলে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক টিকবে। কৃষিকাজে পানির ব্যবহার সীমিত করা গেলে এবং পানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তি ও ফসল চাষের চর্চা সম্প্রসারণ করা হলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর স্থিতিশীল রাখা সম্ভব। অর্থাৎ খাদ্য উৎপাদন ও পানির সুরক্ষা—উভয়ই সমন্বিতভাবে নিশ্চিত করতে হবে।