আসিয়ানের দেওয়া শান্তি পরিকল্পনা ঘিরে মিয়ানমারের জান্তা সরকার প্রকাশ্যে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে—এ অবস্থার মধ্যেই প্রতিবেশী দেশগুলোর কূটনৈতিক ব্যস্ততা নতুন করে চোখে পড়ছে। একদিকে আসিয়ানের কথাবার্তায় অনীহা; অন্যদিকে জান্তাপ্রধান থেকে প্রেসিডেন্ট হয়ে ওঠা মিন অং হ্লাইংয়ের আন্তর্জাতিক সম্মান ফিরিয়ে দিতে নানা সফর ও কর্মসূচি চলছে।
সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন দেশ সফরে মিন অং হ্লাইং সামরিক পোশাকের বদলে সাধারণ স্যুট পরছেন। মুখেও হাসি দেখা যাচ্ছে। তবে এই দৃশ্যমান পরিবর্তনটিতে বাস্তব নেতৃত্বের অবস্থান বদলেছে—এমন কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত নেই। আসিয়ানের প্রতি সাম্প্রতিক বার্তায় সেই বার্তাই প্রতিফলিত হয়: জান্তা বলছে, ভবিষ্যতে আর কোনো বিশেষ দূত দরকার নেই। তারা আটক বেসামরিক নেত্রী অং সান সু চির মুক্তির নতুন চাপ প্রত্যাখ্যান করছে এবং একই সঙ্গে বাহিরাগত ‘হস্তক্ষেপের’ বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারি দিচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে সামরিক সরকার কার্যত বার্তা দিচ্ছে—আঞ্চলিক সম্পর্কের শর্ত তারা নিজেরাই ঠিক করবে।
আসিয়ান সম্প্রতি পুনরায় তাগিদ দিয়ে বলেছিল, জান্তার পাঠানো দূতকে সু চিসহ সব পক্ষের সঙ্গেই আলোচনায় বসতে হবে। পাশাপাশি তাঁর শর্তহীন মুক্তির দাবি জানানো হয়। জবাবে নেইপিদো একপ্রকার স্পষ্ট করে জানায়: তাদের মধ্যকার সংকট সমাধানের জন্য আসিয়ানের কোনো মধ্যস্থতার প্রয়োজন নেই। নিজেদের সংকট তারা নিজেদের শর্তে সামলাবে।
.এই সময়ে মিন অং হ্লাইংয়ের কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপও এক ধরনের বার্তার অংশ হয়ে উঠছে। মে মাসের শেষের দিকে হ্লাইংকে অভ্যর্থনা জানায় ভারত। জুনে চীন আর জুলাইয়ে লাওস সফর করেন তিনি। অন্যদিকে ভবিষ্যতে আসিয়ানে মিয়ানমারের পূর্ণ অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেওয়ার পক্ষে সওয়াল তুলে আগস্টে তাঁর জন্য লালগালিচা সংবর্ধনার ব্যবস্থা করে থাইল্যান্ড।
থাইল্যান্ড-মিয়ানমার যৌথ বিবৃতিতে বিষয়টি আরও একধাপ এগিয়ে নেওয়া হয়। আসিয়ানের সার্বিক প্রক্রিয়ায় মিয়ানমারের ‘পূর্ণ ও সমান অংশগ্রহণ’ নিশ্চিতে থাই সরকার পাশে থাকার অঙ্গীকার করে। বিপরীতে আসিয়ানের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরিতে ‘সহযোগিতা করার জন্য’ ব্যাংকককে ধন্যবাদ জানায় নেপিদো।
প্রতিবেশী সরকারগুলোর এমন আচরণের পক্ষে ‘বাস্তবসম্মত কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি’ দেখিয়ে সাফাই দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু নেইপিদোর অবস্থান থেকে যে বার্তাটি সবচেয়ে জোরালোভাবে আসে, তা হলো—মিন অং হ্লাইং আসিয়ানের দাবি অনায়াসে এড়িয়ে যেতে পারেন। নিজের দেশে নৃশংস গৃহযুদ্ধ চালিয়ে গেলেও প্রতিবেশীদের কাছ থেকে কোলাকুলি, খাতির আর সম্মান মিলছে—এটাই সেই বার্তার সারমর্ম।
আঞ্চলিক কূটনীতিকেরা যখন জান্তার সঙ্গে হাত মেলাতে ব্যস্ত, তখন দেশের ভেতরে একের পর এক বোমা ফেলেও কাজ চালিয়ে যাচ্ছে মিয়ানমার বিমানবাহিনী। স্বাধীন সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা একলেড-এর তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে সামরিক কমান্ডে রদবদলের পর থেকেই রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন এবং বিমান হামলা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়। আর তার পরপরই, ডিসেম্বর ও জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে এপ্রিলে এক সেনাসমর্থিত পার্লামেন্ট মিন অং হ্লাইংকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে বসায়।
পোশাক বা পদের এই পরিবর্তনে দেশের অভ্যন্তরীণ সহিংসতা কমেনি। একলেডের তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের প্রথম অর্ধেকের মধ্যেই জান্তা বাহিনী এক ডজনের বেশি হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে, যাতে সাড়ে চার শর বেশি বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। যাঁদের মাথার ওপর দিনরাত যুদ্ধবিমান ঘুরছে, তাঁদের কাছে আঞ্চলিক সম্পর্কের এই তথাকথিত স্বাভাবিকতার কোনো মূল্য নেই।
.এভাবে স্বাভাবিক আচরণ করার সুযোগ তৈরি হওয়া কোনো হঠাৎ ঘটনা নয়। ধীরে ধীরে প্রতিবেশীদের আচরণে পরিবর্তন আসাই জান্তাকে উৎসাহ জুগিয়েছে। মিন অং হ্লাইংয়ের এই কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপ কেবল তাঁর ব্যক্তিগত সম্মান ফেরানোর লক্ষ্যেই সীমিত নয়; এটি নেইপিদোর জন্য আসিয়ানের চাপ থেকে বের হওয়ার একধরনের বিকল্প পথ তৈরি করে দিতে পারে। চীন, ভারত এবং আসিয়ানের কিছু সদস্যদেশ যদি আলাদাভাবে তাঁর সরকারের সঙ্গে চুক্তি বা সম্পর্ক বজায় রাখে, তবে আসিয়ানের যৌথ শর্ত মানার তাগিদই কমে আসে।
মিন অং হ্লাইং নানা দেশের সঙ্গে আলাদা সম্পর্ক রেখে বিনিয়োগ, কূটনৈতিক মর্যাদা আর নিরাপত্তাসুবিধা পাচ্ছেন। ফলে পুরো জোটের দেওয়া রাজনৈতিক শর্তগুলোকে দুর্বল করার জায়গা তৈরি হয় তাঁর জন্য। প্রতিবেশীদের দেওয়া প্রতিটি লালগালিচা—আসিয়ানের যৌথ দর-কষাকষির শক্তিকেই আরও ক্ষয় করে।
আসিয়ানের পাঁচ দফা শান্তি পরিকল্পনা যতটা কার্যকর হয়নি বলেই দেখা যাচ্ছে, মিয়ানমার সংকট মোকাবিলায় এটিই এখন পর্যন্ত একমাত্র সর্বসম্মত আঞ্চলিক রূপরেখা। তাই নেইপিদোর সঙ্গে দর–কষাকষি যদি আসিয়ানের শর্তের বাইরে গিয়ে আলাদা আলাদাভাবে চলতে থাকে, তবে ‘আসিয়ান শক্তি’ বিষয়টি শেষ পর্যন্ত কাগজে-কলমে সীমিত হয়ে যেতে পারে।
সু চির প্রতি জান্তার আচরণ থেকেও এই বন্দী-কূটনীতির চিত্রটা স্পষ্ট হয়। গত ৩ আগস্ট, মিন অং হ্লাইংয়ের থাইল্যান্ড সফরের ঠিক আগে, আন্তর্জাতিক রেডক্রসের প্রতিনিধিকে সু চির সঙ্গে দেখা করার অনুমতি দেওয়া হয়। আসিয়ান সেই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছিল। কিন্তু এর কয়েক দিনের মধ্যেই সুর বদলে ফেলে নেইপিদো। সু চিকে নিঃশর্ত মুক্ত করার জন্য আসিয়ানের যে আহ্বান ছিল, তা সরাসরি নাকচ করে দেয় তারা।
.প্রতিবেশীদের এই যোগাযোগের পেছনে কিছু অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতির হিসাবও জড়িত থাকতে পারে। থাইল্যান্ডের জন্য জ্বালানি, শ্রমিক, বাণিজ্য এবং সীমান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে মিয়ানমারকে প্রয়োজন। চীনের দৃষ্টি তাদের তৈরি ‘চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর’-এর দিকে; সেখানে স্থিতিশীলতা দরকার। ভারতও চায় সীমান্ত নিরাপত্তা ও খনিজ সম্পদ। সেই কারণে কোনো দেশই নেইপিদোকে পুরোপুরি উপেক্ষা করতে পারছে না।
তবে মূল বাস্তবতা হলো—প্রতিবেশীরা যা চায়, মিন অং হ্লাইংয়ের পক্ষে তা দেওয়ার মতো ন্যূনতম নিয়ন্ত্রণ বা ক্ষমতা এখনো নেই বলেই প্রতীয়মান। মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকাগুলো এখনো ভেঙে পড়া অবস্থায় রয়েছে। চীনের অবকাঠামোগত পথগুলো এমন সব এলাকার ওপর দিয়ে গেছে, যা জান্তার নিয়ন্ত্রণে নেই। এমনকি গুরুত্বপূর্ণ বিরল খনিজসমৃদ্ধ এলাকাগুলোও বর্তমানে কাচিন বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে। ব্যাংককে গিয়ে হাত মেলালেই তো আর ভূমির আসল নিয়ন্ত্রণ পাওয়া যায় না।
এই কারণেই আসিয়ানের শীর্ষ বৈঠকগুলো থেকে মিয়ানমারের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দূরে রাখার সিদ্ধান্তটি এখনও গুরুত্বপূর্ণ। সত্যি কথা হলো, পাঁচ দফা পরিকল্পনা গৃহযুদ্ধ থামাতে পারেনি। কিন্তু এর মানে এই নয় যে জান্তার ওপর থেকে আসিয়ানের সেই অল্প পরিমাণ চাপটুকুও তুলে নিতে হবে।
আসিয়ানের উচিত, এখনই সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের দাবি তুলে ধরা। বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা বন্ধ করা, রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দেওয়া, আন্তর্জাতিক ত্রাণ পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা এবং দেশের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিরোধী দল ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সৎ ও কার্যকর আলোচনার উদ্যোগ নেওয়ার শর্ত দিতে হবে।
.২০০৭ সালে সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা নেতা লি কুয়ান ইউ মার্কিন কূটনীতিকদের বলেছিলেন—মিয়ানমারের জেনারেলদের সঙ্গে কথা বলা আর ‘মৃত মানুষের সঙ্গে কথা বলা’ একই বিষয়।
আজ প্রায় দুই দশক পর, মিন অং হ্লাইং সামরিক পোশাক ছেড়ে স্যুট ধরেছেন এবং নামের আগে ‘প্রেসিডেন্ট’ খেতাব বসিয়েছেন। কিন্তু লি কুয়ান ইউ যে পুরোনো স্বভাবের কথা বলেছিলেন, তা একটুও বদলায়নি।
আসিয়ানের জন্য শিক্ষণীয় বিষয় হলো, কথা বলার অর্থ এই নয় যে নিজের সব শর্ত বা দর-কষাকষির ক্ষমতা বিকিয়ে দিতে হবে। পাঁচ বছর ধরে আসিয়ান অত্যন্ত সঠিকভাবেই মিয়ানমারের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে তাদের শীর্ষ সম্মেলনগুলো থেকে বাইরে রেখেছে।
এই বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকেই একটি স্পষ্ট বার্তা গেছে, যা কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে দেওয়া সম্ভব ছিল না। বার্তাটি হলো: মিয়ানমার এখনো আসিয়ানের সদস্য, কিন্তু তাই বলে মিন অং হ্লাইং এমনিতেই আসিয়ানের শীর্ষ নেতৃত্বের টেবিলে বসার অধিকার পান না। এই আসনই ছিল আসিয়ানের হাতে থাকা অন্যতম প্রধান দর-কষাকষির অস্ত্র।
এখন মূল প্রশ্ন হলো, প্রতিবেশী দেশগুলোর এই আলাদা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক কি মিন অং হ্লাইংকে আসিয়ানের যৌথ শর্ত এড়িয়ে সেই কাঙ্ক্ষিত আসন পাওয়ার সুযোগ করে দেবে? আসিয়ান যদি মিয়ানমারের সহিংস পরিস্থিতি না বদলেই তাদের শীর্ষ পর্যায়ে ফেরায়, তবে তা হবে অত্যন্ত আত্মঘাতী।
নিয়েন চান আয়ে ওয়াশিংটনভিত্তিক একজন বর্মি সাংবাদিক।
এশিয়া টাইমস থেকে সংক্ষেপে অনূদিত