দেশে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অব্যবস্থাপনার চিত্র নিয়মিতভাবে দেখা যাচ্ছে গ্রামাঞ্চলে। কোথাও বছরের পর বছর অর্ধসমাপ্ত সেতু পড়ে থাকে, কোথাও আবার সেতু নির্মিত হলেও প্রয়োজনীয় সংযোগ সড়ক থাকে না। পাবনার ফরিদপুর উপজেলার দেওভোগ-দহপাড়া গ্রামে তেমনই একটি পরিস্থিতি সামনে এসেছে। সেখানে কোটি টাকার একটি সেতু দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু স্থানীয়দের সেতুতে উঠতে বাধ্য হতে হচ্ছে বাঁশের সাঁকো ব্যবহার করে। মূল সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হলেও নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও আজ পর্যন্ত অ্যাপ্রোচ রোড বা সংযোগ সড়ক তৈরি করা হয়নি।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের এক কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্পে কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালনে ঘাটতির বিষয়টি প্রশ্ন তুলছে। সেতুটি মূলত চলনবিলের ১০টি গ্রামের যোগাযোগ সহজ করতে এবং জনগণের দুর্ভোগ কমাতে করা হয়েছিল। কিন্তু সংযোগ সড়কের অনুপস্থিতিতে এখন সেটিই এলাকাবাসীর জন্য চরম দুর্ভোগ ও আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পর বারবার সময় বাড়িয়েও কাজ শেষ না করা এবং বালুসংকটের মতো অজুহাত দেখিয়ে দায়িত্ব এড়ানোর চেষ্টা ঠিকাদারি চক্রের পুরোনো কৌশল হিসেবে প্রতীয়মান হয়। তবে সবচেয়ে উদ্বেগের দিক হলো তদারককারী প্রশাসনের ভূমিকার দৃশ্যমান দুর্বলতা। কাজ শেষ হওয়ার নির্দিষ্ট সময়সীমা অতিক্রান্ত হওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট পিআইও কার্যালয় মূলত ‘তাগিদ দেওয়া’ বা ‘আশ্বাস নেওয়া’ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ রাখছে বলে অভিযোগ উঠছে। স্থানীয় বাসিন্দারা ঝুঁকি নিয়ে নিজেদের খরচে বাঁশের সাঁকো না বানালে এই অসম্পূর্ণ সেতুর সুফল কার্যত শূন্যেই থাকত। সেতুতে উঠতে গিয়ে খাড়া সাঁকো থেকে পড়ে গিয়ে মানুষের দুর্ঘটনার খবরও স্থানীয় পর্যায়ের নজরদারির অভাবকেই সামনে এনে দেয়।
উপজেলা প্রশাসন শেষ পর্যন্ত ঠিকাদারের চূড়ান্ত বিল স্থগিত রাখার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে বিল আটকে দিয়েই দায় সীমিত রাখা ঠিক হবে না। বারবার সময়সীমা পার করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় অর্থ ও মানুষের সময় নিয়ে ছিনিমিনি খেলার প্রবণতা কমতে পারে। একই সঙ্গে সংযোগ সড়ক নির্মাণ দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন করাও জরুরি। উন্নয়নের সুফল যেন কেবল কংক্রিটের কাঠামোয় আটকে না থেকে বাস্তবে মানুষের কাজে লাগে—এটাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব হওয়া উচিত।